Aaj India Desk, কলকাতা: ‘জনসাধারণের ভাষায়, জনসাধারণের জন্য প্রশাসন’—এই লক্ষ্যেই সরকারি কাজে বাংলার (Bengali) ব্যবহার আরও বাড়াতে উদ্যোগী হল রাজ্য সরকার (State Government)। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি প্রশাসন এবং জনপরিষেবায় বাংলা ভাষার ব্যবহার কীভাবে কার্যকর করা হবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করল নবান্ন (Nabanna)। এ নিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্যের কর্মীবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতর।
১ সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু প্রক্রিয়া
নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বাংলাকে প্রধান প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ব্যবহারের কাজ শুরু করতে হবে। গত ২০ জুলাই বিধানসভায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে ঘোষণা করেছিলেন, তারই বাস্তবায়নের পথে এবার নির্দিষ্ট পদক্ষেপ জানাল নবান্ন।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারি দফতরের যোগাযোগে বাংলা ব্যবহারের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি, নোটিস, অধিসূচনা, বিভিন্ন ফর্ম, আবেদন, অভিযোগ, তার উত্তর, সরকারি নির্দেশ এবং জনপরিষেবা সংক্রান্ত তথ্য যতটা সম্ভব বাংলায় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শুধু সরকারি দফতর নয়, পুলিশ-সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলিতেও বাংলার ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ রয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ নেওয়া, তদন্তের সময় যোগাযোগ এবং অভিযোগের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও বাংলাকে বেশি করে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
ধাপে ধাপে বদলাবে সরকারি ব্যবস্থা
একদিনে পুরো প্রশাসনকে বাংলায় বদলে ফেলার বদলে ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। সরকারি কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল পরিষেবা এবং অনুবাদ ব্যবস্থাকে বাংলা ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কাজে প্রয়োজনীয় নতুন বাংলা পরিভাষা তৈরির উপরও জোর দেওয়া হবে।
নজরদারিতে রাজ্যস্তরীয় কমিটি
বাংলায় সরকারি কাজ চালুর প্রক্রিয়া ঠিকমতো এগোচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি ‘রাজ্যস্তরীয় পরিচালন সমিতি’ তৈরি করা হবে। বিভিন্ন দফতর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশ করবে এই কমিটি।
এছাড়াও প্রতিটি সরকারি দফতর এবং জেলায় আলাদা বাস্তবায়ন কমিটি তৈরি হবে। বাংলায় কাজের অগ্রগতি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, অনুবাদ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কতটা তৈরি হয়েছে, তা নজরে রাখবে এই কমিটিগুলি। গোটা কর্মসূচির সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কর্মীবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতরকে। বিভিন্ন সরকারি দফতর ও সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখার কাজও করবে এই দফতর।
তিন মাসের মধ্যে সমীক্ষা
আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রতিটি দফতরকে নিজেদের পরিকাঠামো নিয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা করতে হবে। সরকারি কম্পিউটার ব্যবস্থা, নথি সংরক্ষণ, নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল পরিষেবাগুলি বাংলায় কাজ করার জন্য কতটা প্রস্তুত, তা খতিয়ে দেখা হবে।
একই সঙ্গে কোন দফতরে কতজন বাংলা জানা কর্মী ও আধিকারিক রয়েছেন, কোথায় অনুবাদক বা মুদ্রাক্ষরিক প্রয়োজন, কতজন নথিলিপিকার ও ভাষা বিশেষজ্ঞ দরকার—সেই তথ্যও সংগ্রহ করা হবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেটিও এই সমীক্ষায় উঠে আসবে।
প্রযুক্তিতেও বাড়বে বাংলার ব্যবহার
সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া হবে। তথ্যপ্রযুক্তি দফতর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কেন্দ্রগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল পরিষেবা এবং প্রশাসনিক প্রযুক্তিকে বাংলা ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্মীদের দেওয়া হবে বাংলা প্রশিক্ষণ
সরকারি আধিকারিক এবং কর্মীদের বাংলা ভাষায় কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কীভাবে বাংলায় সরকারি নথি তৈরি করতে হবে, বিভাগীয় চিঠিপত্র লিখতে হবে, সরকারি পরিষেবা পরিচালনা করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে বাংলায় যোগাযোগ করতে হবে—প্রশিক্ষণে সেই বিষয়গুলিই গুরুত্ব পাবে।
প্রতি মাসে দিতে হবে কাজের হিসাব
বাংলায় সরকারি কাজ কতটা এগিয়েছে, তার হিসাব নিয়মিত দিতে হবে। প্রতিটি দফতর এবং জেলা প্রশাসনকে প্রতি মাসে অগ্রগতির রিপোর্ট তৈরি করে সমন্বয়কারী দফতরের মাধ্যমে মুখ্যসচিবের কাছে পাঠাতে হবে। রাজ্যস্তরীয় পরিচালন সমিতির বৈঠকে সেই রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হবে।
তৈরি হবে সরকারি বাংলা শব্দভাণ্ডার
সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহার আরও সহজ করতে অভিধান, সরকারি পরিভাষা, শব্দকোষ এবং বিভিন্ন সহায়ক নির্দেশিকা তৈরি করা হবে। এজন্য ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারি ভাষা সমিতি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কাজে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সহযোগিতাও নেওয়া হবে।
গুরুত্ব থাকবে অন্যান্য মাতৃভাষারও
তবে সরকারি কাজে বাংলার গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য মাতৃভাষাকেও মর্যাদা দেওয়ার কথা স্পষ্ট করেছে নবান্ন। নেপালি, সাঁওতালি, রাজবংশী, কামতাপুরী, কুর্মালি-সহ বিভিন্ন ভাষায় প্রয়োজনীয় সরকারি তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।অর্থাৎ, সরকারি প্রশাসনে বাংলার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি রাজ্যের ভাষাগত বৈচিত্র্যকেও গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চাইছে রাজ্য সরকার।


