কলকাতা: মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধান। জোড়াফুল থেকে পদ্মফুল, অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের (Koel Mallick) রাজনৈতিক পথ বদলে গেল দ্রুত। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর আস্থা রেখে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন অভিনেত্রী। পরে পেয়েছিলেন রাজ্যসভার সদস্যপদও। কিন্তু নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর রাজ্যসভার পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। সেই সময় থেকেই তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে শুরু হয়েছিল জল্পনা। অবশেষে বিজেপির রাজ্যসভা প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা এবং সোমবার আনুষ্ঠানিক ভাবে গেরুয়া শিবিরে যোগ, কোয়েলের রাজনৈতিক ‘ফুল বদল’-এর বৃত্ত সম্পূর্ণ।
কিন্তু কেন বিজেপি? কোয়েলের (Koel Mallick) কথায় কি মিলছে তার ইঙ্গিত? আর এই গেরুয়া যাত্রার নেপথ্যে কি কোথাও রয়েছেন বাবা, অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক?সাংবাদিক বৈঠকে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বারবার ফিরে গেলেন ছোটবেলার স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতির কেন্দ্রে ছিলেন তাঁর বাবা রঞ্জিত মল্লিক। কোয়েল জানান, ছোটবেলায় সংবাদপত্র পড়ার সময় বাবাকে প্রায়ই বলতে শুনতেন, ‘ইশ, এটা কেন এমন হল’, ‘ইশ, ওটা কেন এমন হল না!’ কখনও রাজ্যে আরও স্কুল তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, কখনও বাংলার ছেলেমেয়েরা কেন বাইরে চলে যাচ্ছে, কেন রাজ্যেই থেকে কেরিয়ার তৈরি করতে পারছে না, এসব নিয়েই আক্ষেপ করতেন রঞ্জিত।
কোয়েলের (Koel Mallick) বক্তব্য, সেই ছোটবেলার ‘ইশ’-গুলিই তাঁর মনে থেকে গিয়েছে। আর আজ রাজনীতিকে তিনি দেখছেন সেই আক্ষেপের জায়গাগুলিতে কাজ করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। ‘রাজনীতি এমন একটা প্ল্যাটফর্ম, পেপার পড়ে যেটা ইশ বলতাম, সেই জায়গাটায় কিছু করার সুযোগ দেবে।’
তবে এখানেই উঠে আসছে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ইঙ্গিত। তৃণমূল সরকারের আমলে এমন বহু ‘ইশ’ থেকে গিয়েছে কি না, প্রশ্ন উঠতেই কোয়েল সরাসরি কোনও দলের সমালোচনায় যেতে চাননি। বরং জানিয়ে দেন, বিষয়গুলি তিনি উহ্যই রাখতে চান। কাউকে খারাপ বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়।
তাহলে কি বাবার সেই পুরনো আক্ষেপই কোয়েলের রাজনৈতিক ভাবনার ভিত তৈরি করেছিল? নাকি সাম্প্রতিক বাংলার উন্নয়ন দেখেই বিজেপির দিকে ঝুঁকলেন অভিনেত্রী? কোয়েলের নিজের বক্তব্যে দুইয়েরই যেন মিশেল।
তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা দেখে তিনি খুশি। আর সেই দেখেই বিজেপিতে আসার সিদ্ধান্ত। একইসঙ্গে তাঁর দাবি, তিনি কখনও কোনও ব্যক্তি বা দলকে খারাপ কথা বলতে চান না। বাংলার মানুষ যেন আনন্দে থাকে, সেটাই তাঁর লক্ষ্য।
কোয়েলের (Koel Mallick) রাজনৈতিক বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান তাঁর অগ্রাধিকারের জায়গায়। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ‘টক্সিসিটি’ বা ব্যক্তি আক্রমণ দেখা যায়, তার পিছনেও রয়েছে কাজের অভাব এবং মানুষের হতাশা। আরও স্কুল তৈরি হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ত, কাজের সুযোগ তৈরি হলে মানুষের ক্ষোভও কমত বলে মনে করেন তিনি।
নিজের মনোবিজ্ঞানের পড়াশোনার প্রসঙ্গ টেনে কোয়েল বলেন, যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যকে আক্রমণ করেন, তাঁদের উপর তাঁর রাগ নেই। বরং তাঁদের আচরণের পিছনে থাকা হতাশা ও মানসিক অস্বস্তিটা তিনি বুঝতে পারেন।
রাজনীতিতে এসে কাউকে ছোট করতে চান না কোয়েল। তাঁর দাবি, প্রত্যেক দলই নিজের মতো করে মানুষের জন্য ভালো করার চেষ্টা করে। তবে বর্তমানে যে দলে যোগ দিয়েছেন, গত কয়েক মাসে সেই দলের উন্নয়নমূলক কাজ তাঁকে আশাবাদী করেছে।
আর মানুষের জন্য কাজ করার এই ইচ্ছার শিকড়ও নাকি অনেক পুরনো। ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে মা তাঁকে নিয়ে যেতেন মিশনারিজ অফ চ্যারিটিতে। সেখান থেকেই সমাজের অন্য বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয়। মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছেটাও তৈরি হয় তখনই।
তাই কোয়েলের (Koel Mallick) গেরুয়া যাত্রাকে শুধুই ‘ফুল বদল’ হিসেবে দেখছেন না অভিনেত্রী নিজে। তাঁর কথায়, এটি মানুষের জন্য কাজ করার একটি নতুন সুযোগ। আর সেই পথের শুরুটা যদি সত্যিই হয়ে থাকে ছোটবেলায় বাবার মুখে শোনা অসংখ্য ‘ইশ’ থেকে, তাহলে কোয়েলের রাজনৈতিক ইনিংসে রঞ্জিত মল্লিকের সেই আক্ষেপগুলিও নিঃশব্দে একটি চরিত্র হয়ে থাকছে।


