28 C
Kolkata
Friday, April 17, 2026
spot_img

উন্নয়ন অন সিজন 

          OBSERVER’S PIECE 

ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই পাড়ার মোড়ে অদ্ভুত এক শব্দ পেলাম। রাস্তায় নামতেই চোখে পড়ল, গত পাঁচ বছর ধরে যে গর্তগুলো এড়িয়ে হাঁটতে হতো, সেখানে আজ টাটকা পিচ ঢালা হচ্ছে। একটু দূরে বহুদিনের নিভে থাকা লাইটপোস্টে হঠাৎই বাল্ব লাগানো হচ্ছে। একটু এগোতেই মোড়ের চায়ের দোকানে ফিসফাস কানে এলো, “ভোট আসছে বুঝলি!”

হ্যাঁ, আজকের দিনে এভাবেই বোঝা যায় যে ভোট আসছে। প্রকৃতির মতোই রাজনীতিতেও ভোটের সময় ঋতু বদলায় আর সেই ঋতুতে জন্ম নেয় দুই অদ্ভুত জিনিস, “সিজনাল নেতা” ও “সিজনাল উন্নয়ন”! এরা ক্যালেন্ডার মেনে চলে না, চলে নির্বাচনের ঘড়ি মেনে।

সারা বছর যাঁদের খোঁজ মেলা দায়, তাঁরা হঠাৎই হয়ে ওঠেন পাড়ার সবচেয়ে সহজলভ্য মানুষ। গলির মোড় থেকে বাজার, সবখানেই তাঁদের উপস্থিতি। তাঁদের কুশল বিনিময়ের ভঙ্গিতে মিশে থাকে অদ্ভুত আন্তরিকতা, যেন বহুদিনের সম্পর্ক। ভাষাও বদলায়, মানুষের অভিযোগের উত্তরে কঠিন প্রতিশ্রুতির বদলে আসে নরম আশ্বাস। “দেখছি”, “হবে”, “আপনাদের পাশে আছি”এই শব্দগুলোই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অভিধানের মৌসুমি ফুল। এই বছরে তো এই আন্তরিকতা আরও বেড়ে রান্নাঘর পর্যন্ত চলে গেছে!

উন্নয়ন আর বিকাশও অবশ্য একই ছন্দে তাল মেলায়। যে রাস্তা বছরভর অবহেলায় পরে থাকে, তা রাতারাতি মসৃণ হয়ে যায়। যে নর্দমা দুর্গন্ধ ছড়াত, তা হঠাৎ পরিষ্কার। যে এলাকায় আলো পৌঁছয়নি, সেখানে হঠাৎই আলো লাগানোর ধুম। যেন এক অদৃশ্য নির্দেশে গোটা ব্যবস্থাই কিছুদিনের জন্য চাঙা হয়ে ওঠে। তবে কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতার বলেই ভোটের পরেই সেই সাময়িক উন্নয়ন আবার আগের হতশ্রী রূপে ফিরে যায়।

সাধারণ মানুষ অবশ্য এই দৃশ্যের সঙ্গে অপরিচিত নয়। বরং এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। যেমন গ্রীষ্মে আম, শীতে কমলা, তেমনই ভোটের আগে নেতা আর উন্নয়ন! সময়মতো আসে, কিছুদিন থাকে, তারপর মিলিয়ে যায়। রাজনীতির এই মৌসুমি চরিত্র আসলে বৃহত্তর সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। এখানে দায় শুধু নেতাদের নয়, প্রত্যাশারও। আমরা হয়তো এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি এই চক্রে, যে স্থায়ী পরিবর্তনের দাবি তোলার বদলে সাময়িক উন্নয়নেই আমরা সন্তুষ্ট হয়ে পড়ি।

তবু প্রতিবার ভোটের আগে এই নতুন রং, নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন উপস্থিতি সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আশার বাতাবরণ তৈরি হয়। মনে হয়, হয়তো এবার কিছু বদলাবে। “সিজনাল” শব্দটা হয়তো একদিন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।

কিন্তু বাস্তব কি সেই আশাকে সমর্থন করে? প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সেই একই উন্নয়নের জোয়ারে ভাসমান সাধারণ নাগরিকদের আশা যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে এসেছে। ভোটের আগে যে আলো জ্বলে ওঠে, তা কি ভোটের পরেও জ্বলে থাকে? যে রাস্তা মেরামত হয়, তা কি টিকে থাকে পরের বর্ষা পর্যন্ত? আর যে নেতারা হাত মেলান, তাঁদের উপস্থিতি কি থাকে ভোট-ফল ঘোষণার পরেও?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কেবল ব্যঙ্গের নয়, দায়বদ্ধতার। ভোটের আগে যে তৎপরতা দেখা যায়, সেটাকেই যদি সারা বছরের নিয়মে পরিণত করা যায়, তবেই বদল সম্ভব। এর জন্য দরকার আমাদের, সাধারণ ভোটারদের সচেতনতা। তখনই হয়তো “সিজনাল” শব্দটা রাজনীতির অভিধান থেকে মুছে গিয়ে জায়গা নেবে স্থায়ী পরিবর্তন।

(স্নেহা পাল)

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন