SPECIAL FEATURE
একসময় বাঙালির দিন শুরু হত তিথি-নক্ষত্র দেখে। একাদশী, সংক্রান্তি, অম্বুবাচী-এসব ছিল জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের অংশ। কোন দিন কী খাওয়া হবে, কখন পুজো, কখন উপোস-সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের নিয়ম আর অভ্যাস। বাংলা সাল-তারিখও তখন শুধু ক্যালেন্ডারের সংখ্যা ছিল না, ছিল দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী।
আজ সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন আমাদের দিন চলে ইংরেজি ক্যালেন্ডার মেনে, মোবাইলের রিমাইন্ডারে। বাংলা তারিখ কোথাও লেখা থাকে বটে-খবরের কাগজে, পঞ্জিকায়-কিন্তু তা যেন চোখে পড়েও পড়ে না। বাংলা মাসের নাম অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। তিথি-নক্ষত্রের দরকার পড়ে শুধু বিয়ে বা পুজোর দিন ঠিক করতে। তার বাইরে সেগুলো আমাদের জীবনে খুব একটা জায়গা করে নিতে পারে না। পঞ্জিকা এখনও বাড়িতে টাঙানো থাকে, কিন্তু তা যেন শুধু দেওয়াল সাজানোর অংশ হয়ে গেছে। তবুও সবকিছুর মাঝেও একটা দিন আছে, যেদিন হঠাৎ করেই বাঙালিয়ানা যেন জেগে ওঠে। সেই দিনটা পয়লা বৈশাখ।
এই একদিনেই যেন বাঙালিয়ানা ফিরে আসে নতুন করে। সকাল থেকেই নতুন জামাকাপড়, বাড়িতে আলপনা, মিষ্টির গন্ধ-একটা আলাদা আবহ তৈরি হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় “শুভ নববর্ষ” বার্তা ভেসে আসে, সবাই যেন একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে। দোকানে দোকানে হালখাতা খোলার রেওয়াজ এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কোথাও কোথাও এখনও পুরনো খদ্দেরদের ডেকে মিষ্টিমুখ করানো হয়, নতুন খাতা খোলা হয় শুভক্ষণ দেখে। একসময় এই দিনটার আলাদা গুরুত্ব ছিল। একসময় এই দিনটা শুধু উৎসব ছিল না, ছিল নতুন করে শুরু করার দিন। সারা বছরের ধার-বাকি মিটিয়ে নতুন করে হিসেব শুরু করার দিন ছিল এই পয়লা বৈশাখ। মধ্যবিত্ত সংসারে এই দিনটা ছিল একধরনের দায়িত্বও। এখন সেই প্রথা অনেকটাই ফিকে, কিন্তু স্মৃতিতে তার রেশ এখনও রয়ে গেছে।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়-আমরা কি তবে সারা বছর বাঙালি থাকি না?
আমরা সারা বছর ইংরেজি তারিখে চলি, বাংলা মাস-তারিখ ভুলে যাই, তিথি-নক্ষত্রের ধার ধারি না। অথচ পয়লা বৈশাখ এলেই পাঞ্জাবি-পাজামা পরে, সোশ্যাল মিডিয়ায় “শুভ নববর্ষ” লিখে আমরা হঠাৎ করে বাঙালি হয়ে উঠি। এই পরিবর্তনটা কি শুধুই আবেগের? হয়তো এর মধ্যে এখনও একটা মানসিক টান আছে। নতুন বছর মানেই নতুন করে শুরু করার ইচ্ছে। মনে হয়, এবার হয়তো কিছু ভালো হবে। সেই আশাতেই আমরা একটু অন্যরকমভাবে দিনটা কাটাতে চাই।
পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলোতে তো এখন পয়লা বৈশাখ অনেকটাই ‘ইভেন্ট’-এ পরিণত হয়েছে। রেস্তোরাঁয় বিশেষ মেনু, শপিং মলে অফার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-সব মিলিয়ে এক উৎসবের আবহ। কিন্তু এই উৎসব কি আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কোনও ছাপ ফেলে?
গ্রামবাংলায় এখনও কিছুটা অন্য ছবি দেখা যায়। সেখানে পঞ্জিকার ব্যবহার পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিছু রীতি এখনও টিকে আছে। কিন্তু শহুরে জীবনে বাংলা সাল-তারিখ যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিধিনিষেধের কারণে উৎসবের রঙ কিছুটা বদলেছে। তবু মানুষ সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ছে, ভিড় করছে-একটু আনন্দ খুঁজে নিতে চাইছে। যেন এই একদিনেই বছরের সব ক্লান্তি ভুলে থাকার চেষ্টা। তাই আজ প্রশ্নটা আরও জরুরি হয়ে উঠছে-বাঙালিয়ানা কি শুধু পয়লা বৈশাখেই সীমাবদ্ধ?
বাঙালি হওয়া শুধু একটি দিনের উৎসব নয়, এটা এক ধরনের জীবনযাপন। ভাষা, খাদ্য, সংস্কৃতি, ভাবনা-সব মিলিয়ে তৈরি হয় এই পরিচয়। যদি সেটা শুধু একদিনের জন্য জেগে ওঠে, তাহলে তার গভীরতা কোথায়? হয়তো নতুন বছরের কাছে আমাদের খুব বড় কোনও চাওয়া নেই।শুধু এইটুকুই-
আমরা যেন শুধু পয়লা বৈশাখে নয়, সারা বছর জুড়েই বাঙালি হয়ে থাকতে পারি।


