কলকাতা: কেউ অবসর নিয়েছেন, কেউ সংসারের সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন। কারও কাছে সেই টাকা ছিল ভবিষ্যতের ভরসা, কারও কাছে সন্তানের পড়াশোনা বা চিকিৎসার সম্বল। কিন্তু রোজভ্যালি (Rose Valley) চিটফান্ড কাণ্ডের পর কেটে গিয়েছে প্রায় ১১ বছর। এখনও বহু আমানতকারী অপেক্ষায়, কবে ফিরবে তাঁদের টাকা?
এই দীর্ঘ অপেক্ষা এবং টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় ঢিলেমি নিয়ে এবার কড়া অবস্থান কলকাতা হাই কোর্টের। মঙ্গলবার বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ ও বিচারপতি সুদীপ দেবের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাকি সম্পত্তি বিক্রি করে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
আদালতের সামনে উঠে এসেছে আরও চমকে দেওয়ার মতো পরিসংখ্যান। গত ১১ বছরে কমিটির হাতে থাকা সম্পত্তির মূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। অথচ আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে মাত্র ৫৫.৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিপুল সম্পত্তি (Rose Valley) থাকা সত্ত্বেও টাকা ফেরানোর গতি ছিল অত্যন্ত ধীর! এমনটাই আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এই সময়ের মধ্যে নিলাম হয়েছে মাত্র ১০টি সম্পত্তির। ৮০টি সম্পত্তির মূল্যায়ন সম্পূর্ণ হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রচারও হয়েছে মাত্র দু’বার। ফলে বহু সাধারণ আমানতকারী ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারেননি বা এখনও দাবির প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত।
এবার সেই ছবিটাই বদলাতে চায় হাই কোর্ট। আদালতের নির্দেশ, ২০২৬ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ৩২ লক্ষ ৪৩ হাজার ২২০টি মুলতুবি দাবির ভিত্তিতে যোগ্য আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। আর ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাকি সম্পত্তি বিক্রি এবং টাকা বণ্টনের কাজ শেষ করতে হবে (Rose Valley)!
শুধু নির্দেশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে না আদালত। এবার প্রতি মাসে কাজ কতটা এগোল, তার হিসেব দিতে হবে। কমিটিকে নিয়মিত ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ জমা দিতে হবে আদালতে। রোজভ্যালির (Rose Valley) সম্পত্তি বিক্রি এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরানোই ছিল কমিটির মূল দায়িত্ব, এমন পর্যবেক্ষণও করেছে আদালত। একইসঙ্গে কমিটির তত্ত্বাবধানে থাকা ‘চকলেট হোটেলস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে করা অনুমোদনহীন চুক্তিগুলিও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে, এখনও বাজেয়াপ্ত না হওয়া রোজভ্যালির (Rose Valley) সম্পত্তি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিসকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ফরেনসিক অডিট শেষ করে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। আর নির্ধারিত সময়ের পরেও কাজ বাকি থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বিচারপতি এস পি তালুকদারের এক সদস্যের কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে।
১১ বছর ধরে অপেক্ষা। বারবার আশ্বাসের পরও বহু আমানতকারীর হাতে পৌঁছয়নি তাঁদের প্রাপ্য টাকা। এবার আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা সেই অপেক্ষায় নতুন মোড় আনতে চলেছে। । বছরের পর বছর ধরে যে প্রশ্নটা ঘুরছে, ‘আমার টাকাটা কবে ফিরবে?’ এবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই শুরু হল ঘড়ির কাঁটা ধরে কাজের সময়।


