“ভোট দেবেন কোনখানে “?এই চেনা স্লোগানটা শুধু ভোটের উত্তেজনাই বাড়ায় না, ব্যালট পেপারের এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও মনে করিয়ে দেয়। লোকসভা, বিধানসভা থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত নির্বাচন সব ক্ষেত্রেই প্রতীকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর নির্দিষ্ট প্রতীক তো থাকেই, কিন্তু নির্দল বা ছোট অস্বীকৃত দলের প্রার্থীরা পেলেই ব্যালটে যোগ হয় নানান ধরনের নতুন নতুন প্রতীক।
ফলে একটি আসনে যত বেশি নির্দল প্রার্থী থাকেন, ব্যালটে প্রতীকের সংখ্যাও ততটাই বেড়ে যায়। এই প্রতীক বণ্টনের পেছনে নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট নিয়ম যেমন আছে, তেমনি আছে অনেক অজানা ও মজার ইতিহাসও। কখনও দেখা যায় সহজ প্রতীক, আবার কখনও এমন প্রতীকও থাকে যা ভোটারদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে ভোট শুধু প্রার্থী বা দল নয় একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে এই প্রতীকের জগৎ, যা গণতন্ত্রের এক আলাদা রঙিন দিককে তুলে ধরে।প্রথমেই বোঝা দরকার, নির্বাচনী প্রতীকের সঙ্গে নিরক্ষরতার একটি গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। স্বাধীনতার পর যখন দেশে প্রথম নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়, তখন সাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত কম। সেই সময়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা পড়তে বা লিখতে পারতেন না, তাঁরা কীভাবে ব্যালট পেপারে নিজের পছন্দের প্রার্থী বা দল চিনবেন?এই সমস্যারই সমাধান খুঁজতে এগিয়ে আসেন নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা এম. এস. শেঠি। ১৯৫০ সালে তিনি কমিশনে যোগ দেন এবং দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ১৯৯২ সালে অবসর নেন। তাঁর সময়কালেই ভোটের ব্যালটে প্রতীক ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করার ধারণা শক্ত ভিত পায়, যাতে প্রতীকের মাধ্যমেই সাধারণ ভোটার সহজে নিজের পছন্দ চিনে নিতে পারেন।
স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালের শেষ দিকে। সেই সময়ের প্রস্তুতি পর্বে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ করে তোলার একটি বড় উদ্যোগ নেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা এম. এস. শেঠি।ভোটারদের বোঝার সুবিধার কথা মাথায় রেখে তিনি কয়েকটি প্রতীকের পেনসিল স্কেচ তৈরি করেন। এসব প্রতীক এমনভাবে নির্বাচন করা হয়, যাতে সেগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে সহজেই যুক্ত হতে পারে। কোদাল, বেলচা, ফুল, গাছের পাতা কিংবা উদীয়মান সূর্যের মতো সাধারণ ও পরিচিত চিত্রই ছিল তাঁর আঁকা প্রতীকগুলোর মধ্যে। দীর্ঘ কর্মজীবনে শেঠি মোট প্রায় ১০০টি প্রতীকের একটি তালিকা তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে সেই তালিকাই নির্বাচন কমিশনের প্রতীক ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে ওঠে। আজও এই তালিকা থেকেই নির্দল প্রার্থী বা নতুন রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রতীক বেছে নিতে হয়। ফলে স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা সেই প্রতীক ব্যবস্থা এখনও দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের প্রতীক শুধু পরিচয়ের মাধ্যম নয়, বরং তার ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। জাতীয় দলগুলির ক্ষেত্রে যেমন কংগ্রেস, বিজেপি বা সিপিএম তাদের নিজস্ব প্রতীক থাকে, যার মাধ্যমে তারা দেশজুড়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। একইভাবে তৃণমূল কংগ্রেস বা ফরওয়ার্ড ব্লকের মতো আঞ্চলিক দলগুলি নিজেদের রাজ্যে স্থায়ী প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও, অন্য রাজ্যে নির্বাচনে অংশ নিলে নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত মেনে চলতে হয়।তবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু নজির রয়েছে যেখানে একটি দলের প্রতীক সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ কংগ্রেস। একসময় এই দলের প্রতীক ছিল ‘জোড়া বলদ ও জোয়াল’। পরে দল বিভক্ত হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের প্রতীক হয় ‘গাই বাছুর’। এরপর ১৯৭৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে কংগ্রেসের স্থায়ী প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয় ‘ হাত ‘ ।
অন্যদিকে, বর্তমান শাসক দল বিজেপির প্রতীকের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। জনসঙ্ঘের সময় তাদের প্রতীক ছিল ‘হাতলওয়ালা প্রদীপ’। পরবর্তীতে জনতা পার্টির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর তাদের প্রতীক হয় ‘লাঙল কাঁধে কৃষক’। শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি হিসেবে আত্ম প্রকাশের পর থেকে তাদের স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠে ‘পদ্ম’, যা আজও তাদের পরিচয়ের মূল চিহ্ন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নির্বাচনী প্রতীক সংক্রান্ত নিয়মেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে নতুন দল বা নির্দল প্রার্থীরা চাইলে বহু ধরনের প্রতীক ব্যবহার করতে পারতেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কংগ্রেস নতুন দল হিসেবে এলে ‘হাত’ প্রতীকও পেত না, কিংবা বহুজন সমাজ পার্টির মতো দল ‘হাতি’ প্রতীকে লড়তে পারত না।
পরে বিভিন্ন আপত্তি ও নীতিগত আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, কোনো পশু বা শরীরের অংশকে আর নতুন প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ করা হবে না। ফলে এখন কোনো নতুন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে তাদের কমিশনের নির্ধারিত প্রতীক তালিকা থেকেই বেছে নিতে হয়।এই তালিকা থেকেই এসেছে বহু পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীক। যেমন তৃণমূল কংগ্রেস তাদের প্রতীক হিসেবে বেছে নেয় ‘ঘাসের উপর জোড়া ফুল’, যা আজ তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।অন্যদিকে, আম আদমি পার্টি জাতীয় স্তরে পরিচিতি পায় ‘ঝাঁটা’ প্রতীকে। যদিও এটি আগে নৈতিক পার্টির প্রতীক ছিল, কিন্তু ২০১২ সালে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় কোনো আসন না পাওয়ার পর সেই দল স্থায়ী প্রতীকের স্বীকৃতি হারায়। পরে তাদের আবেদন গ্রহণ করা হয়নি, কারণ ততদিনে ওই প্রতীক কার্যত আম আদমি পার্টির পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে, প্রতীক শুধু চিহ্ন নয় সময়ের সঙ্গে তা রাজনৈতিক পরিচয় ও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে, যার উপর নির্ভর করে ভোটের প্রচার ও জনমানসের পরিচিতিও। ভারতে সাক্ষরতার হার আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে নির্বাচনী প্রতীক ছাড়া ভোটব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচয়ও এখন গভীরভাবে তাদের প্রতীকের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব আরও বেশি। তাই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় বাস্তবতা মাথায় রেখে বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের জন্য আলাদা প্রতীক তালিকা তৈরি করেছে। পুরসভা, পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েত সব ক্ষেত্রেই প্রতীকের তালিকায় ভিন্নতা রাখা হয়। কারণ, শহরের ভোটারদের কাছে যে প্রতীক খুব পরিচিত, গ্রামের মানুষের কাছে সেটি ততটা সহজবোধ্য নাও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শহরে ‘উড়োজাহাজ’ প্রতীক যতটা পরিচিত, গ্রামে তা ততটা সহজে বোঝা নাও যেতে পারে। তাই প্রতীক নির্বাচনে স্থানীয় চেনা পরিবেশ ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আরও মজার বিষয় হলো, বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে প্রতীকও আলাদা হয়ে থাকে। জেলা পরিষদের জন্য যেমন ‘ক্রিকেটার’, ‘সিলিং ফ্যান’ বা ‘লঞ্চ’-এর মতো প্রতীক রাখা হয়, তেমনই গ্রাম পঞ্চায়েতের তালিকায় থাকে ‘রেডিও’, ‘বাল্ব’, ‘আম’, ‘কাঁঠাল’ কিংবা ‘টিউবওয়েল’-এর মতো সহজ ও পরিচিত চিহ্ন। আবার পঞ্চায়েত সমিতির ক্ষেত্রে ‘মোবাইল ফোন’ বা ‘অটোরিকশা’-র মতো আধুনিক প্রতীকও দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো প্রতীক এমন হতে হবে যা সাধারণ মানুষ সহজে চিনতে ও মনে রাখতে পারেন, এবং একই সঙ্গে সহজে আঁকা বা ছাপানো যায়। তাই প্রতীকগুলো সাধারণত সাদা -কালো স্কেচ আকারে দেওয়া হয়, যাতে প্রার্থীরা সহজে ব্যবহার করতে পারেন এবং ভোটারদের কাছেও তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছে যায় ।
( সুরভী কুন্ডু)


