SPECIAL FEATURE
দেবী, রাঁচি: আকাশছোঁয়া শাল-সেগুনের ফাঁক গলে শেষ আলোটা যেন লুকোচুরি খেলছে লাল মাটির সঙ্গে। ঢেউ খেলানো ধু ধু প্রান্তরের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ডিসেম্বরের রুক্ষ বাতাস। কি অদ্ভুত রুক্ষ অথচ মায়াবী দৃশ্য…জঙ্গলের বুক চিরে অজগরের মতো পেঁচিয়ে এগিয়ে গেছে কালো পিচের রাস্তা। দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছেন ড্রাইভার সাহেব ভাটিন্ডাজি। প্রায় ২ দশক ধানবাদে সপরিবারে বসবাস করছেন গুরুদাসপুরের এই সর্দারজি। জঙ্গলে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। সন্ধ্যা নামার আগেই তেতেঙ্গাবাদের জঙ্গল ছাড়ার তাগিদ তাঁর চোখে-মুখে স্পষ্ট। তাঁর সতর্ক কণ্ঠস্বর মিলিয়ে যায় ইঞ্জিনের শব্দে, আর আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি এক অন্য ভূগোল—নিস্তব্ধ, অথচ গল্পে ভরা।
এখানকার নীরবতা নিছক শান্ত নয়, যেন সময়ের স্তরে স্তরে জমে থাকা ইতিহাসের ভার। লাল মাটি, শাল-সেগুন, শীতের বাতাস…সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য আবহ, যেখানে অতীতের প্রতিধ্বনি এখনও ভেসে বেড়ায়। মনে হয়, এই জঙ্গল শুধু গাছের নয়! এ জানে মানুষের ক্ষোভ, সংগ্রাম, আর সেই শব্দটির গভীর মানে, যার নাম “বিপ্লব” (Maoists)।
আত্মসমর্পণ নয়, মৃত্যু—শেষ লড়াইয়ের মুখে মাওবাদীরা
বঞ্চনা, প্রতারণা আর দীর্ঘদিনের অবজ্ঞার ক্ষত বুকে নিয়ে একসময় অস্ত্র তুলে নিয়েছিল তারা। আশি-নব্বইয়ের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে সিংভূম, বোকারো, চাতরা, ধানবাদ, গিরিডি, লাতেহার, দুমকা রামগড়ের-এর জঙ্গল। তবে সংঘাতের দীর্ঘ ছায়া সরিয়ে এখন উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু করতে চাইছে কেন্দ্র। ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে মাওবাদী প্রভাবিত এলাকাগুলিতে একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
একসময় দেশের ৭৬টি জেলা মাওবাদী প্রভাবের আওতায় থাকলেও, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭-এ। এর মধ্যে রয়েছে ছত্তিসগড়ে-এর পাঁচটি জেলা, ঝারখন্ডের পশ্চিম সিংভূম এবং ওড়িশার কান্ধামাল। ৩১ মার্চের মধ্যে মাওবাদীদের (Maoists) নির্মূল করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অমিত শাহ। ইতিমধ্যেই একের পর এক শীর্ষ নেতার আত্মসমর্পণ ও মৃত্যুর ঘটনায় সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ। কিষেণজির পরিবার-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। এখনও প্রায় ১৫০ জন সশস্ত্র মাওবাদী (Maoists) সদস্য ও কেন্দ্রীয় কমিটির দুই সদস্য নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে!
আত্মসমর্পণ না করলে সংঘর্ষ অনিবার্য বলেই ইঙ্গিত। বছরের পর বছর ধরে জঙ্গলের অন্ধকারে জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ আর সংগ্রামের ইতিহাস কি তবে থামবে এই সময়সীমার কাছে? নাকি শেষ মুহূর্তেও জ্বলে উঠবে আগুন? অনিশ্চয়তা আর আশার টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন একটাই…৩১ মার্চের দিনটি কি সত্যিই ইতি টানবে দীর্ঘদিনের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ে?


