Aaj India Desk, কলকাতা : রেলের ঘড়িতে সময় চলে ২৪ ঘণ্টার কাঁটায়, দিন-রাতের ফারাক সেখানে কেবল কাগজে-কলমে। কিন্তু সেই ঘড়ির কাঁটা কি এখন শুধু প্ল্যাটফর্মেই নয়, পৌঁছে যাচ্ছে কর্মীদের শরীর-মনেও? সময়ের এই হিসেবে চমকে উঠলো খোদ কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)।
সোমবার হাইকোর্টে এক মামলায় জমা পড়া নথিতে দাবি করা হয়, হাসনাবাদ স্টেশনের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা এক রেলকর্মীকে টানা ১৯ ঘণ্টা কাজ করানো হয়েছে। রেলের তরফে দাখিল করা রিপোর্টেও এই তথ্য স্বীকার করা হয়। এই ঘটনাতেই হতবাক হন প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ।
কী বলছে শ্রম কোড ?
রেল কর্মীদের নির্ধারিত সময়ের পরেও অতিরিক্ত কাজ করানোর অভিযোগ নতুন নয়। রেলের তরফে কর্মীসংখ্যার ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি এই জনস্বার্থ মামলা শ্রম আইন ও মানবাধিকার দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
রেল আইন অনুযায়ী নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত কর্মীদের টানা ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যায় না। ভারতের শ্রম আইন, যেমন ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট, ১৯৪৮ এবং অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশনস কোড, ২০২০, অনুযায়ী, কর্মীদের সাপ্তাহিক কাজের সীমা ৪৮ ঘণ্টা। দৈনিক কাজ সাধারণত ৮-৯ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা, সঙ্গে নির্দিষ্ট বিরতির বিধান রয়েছে। অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্বিগুণ হারে মজুরি দেওয়ার কথাও আইনে উল্লেখ আছে। অন্যদিকে, ক্লারিক্যাল কর্মীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ১০ ঘণ্টা। কিন্তু বাস্তবে বেশ কিছু কাজের ক্ষেত্রেই এই সমস্ত নিয়ম মানা হচ্ছে না। মামলার আবেদনকারী আইনজীবী তথাগত দত্ত নথি তুলে ধরে দাবি করেন, বহু ক্ষেত্রে ভারতীয় রেলওয়ে এই সীমা লঙ্ঘন করেছে। এতে শুধু শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, যাত্রী সুরক্ষাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
কোর্টের নির্দেশ মানেনি রেল !
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছরই কলকাতা হাইকোর্টের (Kolkata High Court) তৎকালীন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞনম ও বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের বেঞ্চ রেলকে কর্মীদের কাজের সময়সীমা নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে বর্তমান শুনানিতে।
এই ঘটনায় যে সরকার নিজেই সংবিধান ও শ্রম আইনের রক্ষক, তার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ উঠছে কীভাবে তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। কর্মীদের নির্ধারিত কাজের সময়, বিশ্রাম ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সেই জায়গায় ঘাটতি থাকলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায় যার উত্তর শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হয়। তবে এই ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত সরকার বা রেলওয়ে মন্ত্রকের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। আদালতের (Kolkata High Court) নির্দেশ অনুযায়ী, পরবর্তী শুনানিতে হাসনাবাদ স্টেশন মাস্টারের মূল ডায়েরি ও উপস্থিতি খাতা জমা দিতে হবে। এরপর আদৌ এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় সরকারের উপর বর্তাবে নাকি সম্পূর্ণ দায় এড়িয়ে সাময়িক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে তা পরবর্তী শুনানিতেই স্পষ্ট হবে।


