Aaj India Desk, কলকাতা: দাবার (Chess) বোর্ডে জিততে প্রয়োজন বুদ্ধি, ধৈর্য আর কৌশল। কিন্তু এই খেলায় সাফল্যের পথে মহিলাদের অনেককেই লড়তে হচ্ছে বৈষম্য ও হেনস্থার বিরুদ্ধেও। আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা FIDE-র প্রথম বিশ্বব্যাপী সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক ছবি। রিপোর্ট অনুযায়ী, দাবার সঙ্গে যুক্ত প্রতি চার জন মহিলা ও কিশোরীর মধ্যে তিন জন কোনও না কোনও ধরনের বৈষম্য (Inequality) বা হেনস্থার মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিরক্ত হয়ে ৪৪ শতাংশ মহিলা কখনও না কখনও দাবা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছেন।
২০২৬ সালের ৩ অগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২৭টি দেশের ৬৭২ জনের মতামত নিয়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে খেলোয়াড়, কোচ, আম্পায়ার, আয়োজক এবং দাবা সংস্থার আধিকারিকেরা ছিলেন। সবচেয়ে বেশি ৬৯ জন উত্তরদাতা ছিলেন ভারতের। ছিলেন FIDE-র স্বীকৃত ১৩৩ জন মহিলা খেতাবধারী দাবাড়ুও।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৬৩ শতাংশ মহিলা লিঙ্গবৈষম্য এবং ৩৮ শতাংশ যৌন হেনস্থা বা অনুপযুক্ত আচরণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। একই হারে মহিলারা অনলাইন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্যের হার ৭০ শতাংশ এবং যৌন হেনস্থার হার ৪৬ শতাংশ। ১৮ বছরের কম বয়সিদের ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ৪৭ ও ১৭ শতাংশ। খেতাবধারী মহিলা দাবাড়ুদের মধ্যে ৮১ শতাংশ বৈষম্য এবং ৫৫ শতাংশ যৌন হেনস্থার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
বৈষম্যের শিকার মহিলাদের ৫৬ শতাংশ এবং যৌন হেনস্থার মুখোমুখি হওয়া মহিলাদের ৫৮ শতাংশ দাবা ছাড়ার কথা ভেবেছেন। সমীক্ষার বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থাকলে খেলা ছাড়ার কথা ভাবার সম্ভাবনা তিন গুণ বেশি। ১৮-২৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা দ্বিগুণেরও বেশি। খেতাবধারীদের মধ্যেও তা দ্বিগুণ হয়েছে।
শুধু হেনস্থাই নয়, আর্থিক সমস্যাও বড় বাধা। ৬৬ শতাংশ জানিয়েছেন, যাতায়াত, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার খরচ তাঁদের সমস্যায় ফেলে। পড়াশোনা, চাকরি ও পরিবারের দায়িত্বের সঙ্গে দাবার সময় মেলাতে অসুবিধা হয় ৪৮ শতাংশের। মাত্র ৪৪ শতাংশ মহিলা কোনও মহিলা আদর্শ বা পরামর্শদাতা পেয়েছেন। নিজেদের আঞ্চলিক দাবা মহলে মহিলাদের যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব রয়েছে বলে মনে করেন মাত্র ৩৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে ৮৪ শতাংশ মহিলা দাবার পথে মাঝারি বা বড় বাধার কথা জানিয়েছেন, যদিও ৭২ শতাংশের কাছে এই খেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অঞ্চলভেদে বৈষম্যের হার উত্তর আমেরিকায় ৮৩ শতাংশ, দক্ষিণ আমেরিকায় ৭৮, ইউরোপে ৭৪, মধ্য আমেরিকায় ৭৩, এশিয়ায় ৫৩ এবং আফ্রিকায় ৫০ শতাংশ।
FIDE-র মহিলা দাবা কমিশনের চেয়ারপার্সন ট্রিস-অ্যান রিচার্ডস জানিয়েছেন, এই পরিসংখ্যানের পিছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আরও সহজ, গোপনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য করার প্রয়োজন রয়েছে। সমীক্ষায় অবশ্য সক্রিয় দাবাড়ুদের অংশগ্রহণ বেশি ছিল; ইতিমধ্যে খেলা ছেড়ে দেওয়া মহিলারা এতে অন্তর্ভুক্ত হননি। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সম্মতি নেওয়ায় তাঁদের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে।
২০২৩ সালে প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সুসান পোলগার নিজের হেনস্থার অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। গ্র্যান্ডমাস্টার আলেজ়ান্দ্রো রামিরেজের বিরুদ্ধেও একাধিক মহিলা অভিযোগ তোলেন; পরে তাঁকে নিষিদ্ধ করে আমেরিকার দাবা সংস্থা। এই পরিস্থিতি বদলাতে FIDE স্পষ্ট আচরণবিধি, গোপনীয় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আম্পায়ার ও আয়োজকদের প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছে। সংস্থার বক্তব্য, দাবায় মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে বৈষম্য ও হেনস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।


