নয়াদিল্লি: একদিকে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে তথ্য নিয়ে নতুন বিতর্ক। নেপালে (Nepal Flash flood) মৃতের সংখ্যা ৬৭৫-এ পৌঁছেছে বলে শনিবার সন্ধ্যায় রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এখনও ২,৪০০-র বেশি মানুষ নিখোঁজ। অথচ চিনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সরকারি সংবাদমাধ্যমে মৃতের সংখ্যা পাঁচ বলে জানানো হয়েছে। দুই প্রান্তের পরিসংখ্যানের এই বিপুল ফারাকই এখন নজর কাড়ছে।
বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে চিনের সোশ্যাল মিডিয়ায় স্থানীয়দের পোস্ট করা ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ, তিব্বতের গিরং সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধসের (Nepal Flash flood) ছবি তুলে ধরার কিছু ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর সেগুলি আর দেখা যায়নি। তার বদলে চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমে উদ্ধারকাজ, উদ্ধারকারী দল এবং প্রশাসনের তৎপরতার ছবিই বেশি সামনে এসেছে।
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসের পর ল্হেন্দে খোলা নদীতে হড়পা বান (Nepal Flash flood) নামে। বরফ, কাদা, পাথর ও জলের প্রবল স্রোত নেমে আসে নীচের দিকে। নেপালের ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। সীমান্তের দু’দিকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রাম, রাস্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পরিকাঠামো।
এর মধ্যেই দৃষ্টি যায় গিরং বন্দরের দিকে। এটি চিন-নেপাল সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ২৭ আগস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গিরং সীমান্ত চৌকিতে কাদা ও ধসের ভয়াবহ স্রোত আছড়ে পড়ার একটি ভিডিও চিনের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গিরং এলাকায় পরিস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছে তথ্যের ঘাটতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিনা কর্তৃপক্ষ একসময় ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছিল এবং তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম ও বসতিগুলির পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি বলে অভিযোগ।
এদিকে ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তের চিনা অংশে ভয়াবহ বন্যার (Nepal Flash flood) পর অন্তত ৩২০ জন ভারতীয় নিখোঁজ এবং প্রায় ৪০০ জন সেখানে আটকে রয়েছেন। উদ্ধার তৎপরতায় কাঠমান্ডুকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে ভারত।
চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম অবশ্য অন্য ছবি তুলে ধরেছে। শিনহুয়া জানিয়েছে, শত শত উদ্ধারকর্মী, সামরিক ও জরুরি পরিষেবার কর্মীকে দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। হেলিকপ্টার-সহ বিভিন্ন সরঞ্জামও মোতায়েন করা হয়েছে বলে তাদের প্রতিবেদনে জানানো হয়। কমিউনিস্ট পার্টি-নিয়ন্ত্রিত ‘পিপলস ডেইলি’-ও উদ্ধারকাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার নির্দেশ নিয়ে শি জিনপিংয়ের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, দুর্যোগের ভয়াবহতার কতটা ছবি সাধারণ মানুষের সামনে আসছে, আর কতটা শুধুই সরকারি ক্যামেরায় ধরা পড়ছে?
চিনের তথ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এর আগেও অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষক। তাঁদের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দাদের পোস্ট করা ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা সত্যি হলে তা দুর্যোগের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বড় তথ্যঘাটতি তৈরি করতে পারে। তবে ভিডিও সরানোর কারণ সম্পর্কে চিনা কর্তৃপক্ষের কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় চিনের তথ্য-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন সমালোচকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও যদি স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকে, তাহলে নিখোঁজ ও আটকে পড়া মানুষদের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা এবং দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছনো কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে নেপালের ক্ষেত্রে সাংবাদিক, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সরকারি সূত্র থেকে বিপর্যয়ের ছবি ও তথ্য (Nepal Flash flood) তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকাশ্যে আসছে। ফলে সীমান্তের দুই পাশে তথ্যের এই বৈপরীত্যই এখন আন্তর্জাতিক নজরের কেন্দ্রে।
বন্যার জল সীমান্ত মানেনি। কিন্তু তথ্যের স্রোত কি সীমান্ত পেরোতেই থেমে গেল? তিব্বতের স্থানীয়দের ভিডিও সরানোর অভিযোগ, নিখোঁজের সংখ্যা এবং চিনা সরকারি সংবাদমাধ্যমের বাছাই করা কভারেজ! সব মিলিয়ে হিমালয়ের এই ভয়াবহ দুর্যোগ এখন শুধু উদ্ধারকাজের নয়, তথ্যের স্বচ্ছতারও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


