Aaj India Desk, নয়াদিল্লি: গত বুধবার লেন্ডে-ভোটেকোশী-ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ বন্যায় (Flash Flood) নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর ও প্রবল জলস্রোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলার একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Hydropower P)। সেখানকার নির্মাণ এলাকা এবং সুড়ঙ্গগুলিতে (Tunnel) বহু শ্রমিক আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ৯৩৪ জন শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছিলেন। শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে ৩৬১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কেউ কেউ আবার নিজেরাই দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা ধরে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছেছেন। তবে এখনও প্রায় ৫৭৩ জনের কোনও নিশ্চিত খবর নেই। ফলে প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও কতজন আটকে রয়েছেন, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
চার প্রকল্পে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ
নেপালের জ্বালানি ও জলসম্পদ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ও আটকে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে শুধু নেপালের নাগরিকই নন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, চিন এবং জার্মানির নাগরিকরাও রয়েছেন। ১১টি ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটি তখনও নির্মাণের পর্যায়ে ছিল। সেখানে অনেক শ্রমিকের সরকারি নথিভুক্তিও ছিল না। তাই বাস্তবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সরকারি হিসেবের থেকেও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চারটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে প্রায় ৩২২ জন কর্মীর খোঁজ মিলছে না। আপার ত্রিশূলী-৩বি-তে নিখোঁজ ১২২ জন। আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে ৪৩ জন এবং রসুওয়াগধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৪৪ জন নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে।
উদ্ধারকাজে নেপালকে সাহায্য ভারতের
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। শুক্রবার ভারত থেকে পাঠানো তৃতীয় বিমানে ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসা দল কাঠমাণ্ডুতে পৌঁছয়। ভারতীয় দূতাবাসের তরফে জানানো হয়েছে, ওই দলটি ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গ এবং আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছে।
এর পর আরও বড় সাহায্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শনিবার ভারতীয় বায়ুসেনার C-130J Hercules বিমানে করে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ টানেল রেসকিউ টিম নেপালে পৌঁছনোর কথা। সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য এই দলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিশেষ সরঞ্জামও পাঠানো হচ্ছে।
এছাড়াও মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য DNA পরীক্ষায় সাহায্য করতে ছয়টি ফরেনসিক দলের ১৯ জন বিশেষজ্ঞকে পাঠানো হচ্ছে। সঙ্গে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও। ভারতের NDRF-কেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নেপাল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য চাইলে তারা দ্রুত উদ্ধার অভিযানে যোগ দিতে পারবে।
‘মাত্র ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে পাহাড়ে উঠেছিলাম’
ভয়াবহ সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পের কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ার অজয় চৌধুরী। কোনওরকমে প্রাণে বেঁচে তিনি জানান, সকাল ৮টা ৫৯ মিনিট নাগাদ হঠাৎ প্রকল্প এলাকায় বিশাল জলরাশি আছড়ে পড়ে।
অজয়ের কথায়, তাঁরা তখন নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে দ্রুত পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করেন। মাত্র ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে তাঁরা উঁচু জায়গায় পৌঁছতে সক্ষম হন। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেই জল এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন কর্মী নিরাপদ জায়গায় বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তাঁর চোখের সামনেই ধস নেমে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যায়।
একই প্রকল্পের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (HR) অশোক কুমার মণ্ডলও ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, সুড়ঙ্গের মুখে প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু কাদা ও পাথরের স্তূপ জমে গিয়েছে। ফলে ভিতরে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অশোক জানান, তিনি, অজয় এবং আরও প্রায় ১২০ জন শ্রমিক দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় দু’দিন হেঁটে নুওয়াকোটে পৌঁছন। সেখান থেকে বাসে তাঁরা কাঠমাণ্ডু আসেন।
‘চোখের সামনে ভেসে গেল সহকর্মীরা’
অশোকের বর্ণনায় সেই সময়ের ভয়াবহ ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই প্রকল্পের বিদ্যুৎ সংযোগ চলে যায়। এরপর সকাল ৯টা ২ মিনিট নাগাদ পাহাড়ের উপর থেকে তিনি দেখেন, বিশাল জলরাশি প্রায় ৫০ মিটার উচ্চতায় উঠে পুরো প্রকল্প এলাকা ঢেকে ফেলছে।
ত্রিশূলী নদীর অন্য পারে কাজ করছিলেন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন শ্রমিক। তাঁদের কয়েকজনকে চোখের সামনে প্রবল স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছেন বলে জানান অশোক। তাঁর আশঙ্কা, অনেক কর্মী এখনও সুড়ঙ্গের ভিতরে কিংবা ভেঙে পড়া বাঁধের অংশের নীচে আটকে রয়েছেন।
বেঁচে ফেরা শ্রমিকরা জানিয়েছেন, নিচের মূল রাস্তা দিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তাঁরা নিতে পারেননি। ফের বন্যা এলে স্রোতে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই পাহাড়ের উঁচু রাস্তা ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। অনেকেই আঘাত পেয়েছিলেন। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে তাঁদের সাত ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। বর্তমানে তাঁদের কাঠমাণ্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছে একটি আশ্রয়শিবিরে রাখা হয়েছে।
সুড়ঙ্গে ঢুকে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন নেপালি গাইডরাও
নেপাল সেনাবাহিনীও উদ্ধার অভিযানে জোর দিয়েছে। সেনার মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বাসনেত জানিয়েছেন, দুর্গত এলাকায় ১৫টি হেলিকপ্টার এবং ৮৪ জন প্রশিক্ষিত সেনা সদস্যসহ বিপুল সংখ্যক উদ্ধারকারীকে মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি নেপাল মাউন্টেন গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরাও ঝুঁকি নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ করছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তুল গুরুং জানিয়েছেন, চিলমে ২২ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গে অন্তত ছয়জন শ্রমিক আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা ইতিমধ্যেই প্রায় ১৩০ মিটার পর্যন্ত কাদা ও পাথর সরিয়ে এগিয়েছেন। কিন্তু সামনে একটি বড় পাথরের স্তর থাকায় তাঁদের পথ আটকে রয়েছে। সেটি সরিয়ে দ্রুত শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে।
এদিকে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এই আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৬৭৫ ছাড়িয়েছে বলে সর্বশেষ তথ্য। প্রায় ৩,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ শ্রমিকদের নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়ছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ধ্বংসস্তূপ ও কাদায় বন্ধ হয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলিতে দ্রুত পৌঁছে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার করা।


