কলকাতা: রাখিবন্ধনের দিন ক্যাথিড্রাল রোড যেন পরিণত হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে এ বছরের TMCP প্রতিষ্ঠা দিবসের (TMCP Foundation Day) মূল অনুষ্ঠান হয় ক্যাথিড্রাল রোডে। ছাত্র-যুব কর্মীদের ভিড়ে ঠাসা সভামঞ্চ থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন! বই চুরির অভিযোগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন, শুভেন্দু অধিকারী, পুলিশ প্রশাসন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান তিনি।
১. “প্রমাণ দিন, না হলে নাক খত দিন”
দিনের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে বিধানসভার লাইব্রেরি থেকে বই চুরির অভিযোগ প্রসঙ্গে। সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মমতা বলেন, “বলছে আমি নাকি বই চুরি করেছি। সাহস থাকলে প্রমাণ দিতে হবে, তা না হলে নাক খত দিতে হবে।” তাঁর দাবি, তাঁর এত দুঃসময় আসেনি যে লাইব্রেরির বই চুরি করতে হবে। বরং তিনি চাইলে কয়েকটি লাইব্রেরি গড়ে দিতে পারেন। প্রায় সব লেখক-লেখিকার বই তাঁর বাড়িতে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
২. “আমি মুখ্যমন্ত্রী নই, LIP”
নিজের রাজনৈতিক পরিচয় মমতা (Mamata Banerjee) বলেন, সাত বারের সাংসদ, চার বারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ‘মুখ্যমন্ত্রী’ পরিচয় উচ্চারণ করতে ভালো লাগে না। “আমি নিজেকে LIP—Less Important Person ভাবি।”
৩. কনভয় সংস্কৃতি
এর পরই বর্তমান সরকারের কনভয় সংস্কৃতি নিয়ে কটাক্ষ করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি রাস্তা বন্ধ করতে দিতেন না, আর এখন “৪০টা গাড়ির কনভয়” চলছে।
৪. নির্বাচন কমিশনকে তোপ
সভামঞ্চ থেকে সবচেয়ে কড়া রাজনৈতিক আক্রমণ ছিল নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে। মমতার (Mamata Banerjee) অভিযোগ, গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কমিশনকে ব্যবহার করে ভোট “হাইজ্যাক” করেছে। পাশাপাশি SIR-এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
৫. “আমি বেঁচে থাকতে ভোটাধিকার কেড়ে নিতে দেব না”
ছাত্র-যুবদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়ে মমতা বলেন, ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তিনি (Mamata Banerjee) ঘোষণা করেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে কারও ভোটারাধিকার কেড়ে নিতে দেব না!’
৬.পুলিশের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ
সভার কাছেই তিন যুবককে নামাজ পড়ে বেরোনোর সময় পুলিশ আটক করেছে বলে অভিযোগ তোলেন মমতা। তিনি বলেন, যে পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, তারা মানুষের পাশে দাঁড়াত; এখনকার আচরণ সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না।
৭. জেলায় জেলায় পদযাত্রার ঘোষণা
রাখিবন্ধনের দিনই নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর বক্তব্য, অন্যায় দেখলেই তিনি প্রতিবাদ করবেন। প্রশাসন অনুমতি না দিলে জেলায় জেলায় হেঁটেই কর্মসূচি করবেন বলে ঘোষণা করেন।
৮. ছাত্রদের উদ্দেশে কী বললেন?
TMCP-র কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল, গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে ছাত্রসমাজকে সামনের সারিতে থাকতে হবে। সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি (Mamata Banerjee)।
৯. শুভেন্দুকে ঘিরে পরোক্ষ খোঁচা
যদিও নিজের ভাষণে সরাসরি শুভেন্দু অধিকারীর নাম বারবার উচ্চারণ করেননি, তবু বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক ধরন, কনভয় সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে কার্যত বিজেপি সরকারকেই নিশানা করেন। একই সভায় তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও শুভেন্দুকে ভবানীপুরের CCTV প্রকাশ ও ‘বন্দে মাতরম’-এর চার স্তবক একা গাওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
১০. মঞ্চে মানবিক বার্তাও
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক বার্তাও উঠে আসে অনুষ্ঠানে। উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন হকারকে মঞ্চে ডেকে তাঁদের হাতে রাখি পরানো হয় এবং আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। রাখিবন্ধনের আবহে ঐক্য ও সংহতির বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করে তৃণমূল নেতৃত্ব।
ক্যাথিড্রাল রোডের সভা কার্যত স্পষ্ট করে দিল, পরাজয়ের পরও তৃণমূলের রাজনীতিতে আক্রমণাত্মক সুরেই ফিরতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর সেই লড়াইয়ের প্রথম সারিতে রাখতে চাইছেন ছাত্র-যুব সমাজকে।


