Aaj India Desk, নয়াদিল্লি: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আচমকা হড়পা বানে (Nepal Flash Flood) ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বুধবার সকাল প্রায় ৯টা নাগাদ প্রবল জলের স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। ভেসে যায় একের পর এক গ্রাম ও বসতি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলিতে বিপর্যয়ের ভয়াবহ ছবি দেখা যাচ্ছে। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই শতাধিক দেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনও কয়েকশো মানুষ নিখোঁজ বলে জানা যাচ্ছে।
এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ভূবিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদ ডঃ সুজীব করের মতে, এর পিছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা থাকতে পারে। পাশাপাশি নদীর আশপাশে অপরিকল্পিত জনবসতি এবং পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত নির্মাণকেও তিনি বিপদের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নেপাল হিমালয়ের উত্তর দিকে বহু হিমবাহ-নির্ভর লেক রয়েছে। হিমবাহ ধীরে ধীরে নীচে নামার সময় তার সঙ্গে পাথর, নুড়ি ও মাটি নেমে আসে। এতে পাহাড়ের কিছু জায়গায় গর্তের মতো অংশ তৈরি হয়। পরে সেখানে বরফ গলার জল জমে লেক তৈরি হতে পারে। অনেক সময় সেই লেকের উপর বরফের পাতলা স্তর থাকায় বাইরে থেকে বিপদের বিষয়টি বোঝা যায় না।
কোনও কারণে সেই বরফের বড় অংশ ভেঙে লেকের মধ্যে পড়লে আচমকা বিপুল পরিমাণ জল বেরিয়ে আসতে পারে। জল ও বরফের প্রবল স্রোতে নদীর স্বাভাবিক পথ আটকে গিয়ে পরে সেই বাধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে নীচের দিকে ভয়ঙ্কর গতিতে জল নেমে আসে। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে হড়পা বান।
ডঃ সুজীব করের মতে, এই ধরনের ঘটনার জন্য শুধু ভূমিকম্পকে দায়ী করা ঠিক নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রার দ্রুত ওঠানামা এবং অতিবৃষ্টিও বড় কারণ হতে পারে। তাঁর দাবি, নেপালে গত কয়েকদিন ধরে কখনও প্রবল বৃষ্টি, আবার কখনও বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘটনার আগেও তাপমাত্রায় প্রায় ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বড় পরিবর্তন হয়েছিল বলে তিনি জানান।
তাপমাত্রার এমন দ্রুত পরিবর্তনের ফলে বরফের স্তরে ফাটল ধরার সম্ভাবনা বাড়ে। তিব্বত ও নেপালের হিমালয়ের উচ্চতার মধ্যেও বড় পার্থক্য রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বরফের কোনও দুর্বল অংশ ভেঙে নীচে নেমে গিয়ে বিপর্যয় আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
এর সঙ্গে এবারের অনিয়মিত মৌসুমি বায়ুরও যোগ থাকতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞের। তাঁর ব্যাখ্যা, মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিকভাবে এগোতে না পারায় বিভিন্ন সময়ে নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে এবং হঠাৎ করে অনেক জায়গায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ জল নেমে এলে পাহাড়ি মাটি ও নদীখাত সবসময় সেই জল সামলাতে পারে না। ফলে আচমকা বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নেপালে চলতে থাকা বিভিন্ন বড় নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডঃ সুজীব করের মতে, পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে মাটি ও শিলার বাঁধন অনেক জায়গাতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার উপর ভারী নির্মাণ বা বড় প্রকল্পের চাপ পড়লে মাটির ধারণক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রবল বৃষ্টির জল যখন সেই দুর্বল জায়গা দিয়ে নীচে নামে, তখন ধস ও হড়পা বানের মতো বিপর্যয় আরও ভয়ঙ্কর আকার নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল নদী অববাহিকায় দ্রুত বাড়তে থাকা জনবসতি। নদীর খুব কাছে বহুতল ও ঘনবসতি তৈরি হওয়ায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ডঃ সুজীব কর তাই পাহাড়ি ও নদীঘেঁষা এলাকায় পরিকল্পনাহীন নির্মাণ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তাঁর মতে, উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে। প্রকৃতির নিয়মকে উপেক্ষা করে নির্মাণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। আর তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের উপর।


