Aaj India Desk, বীরভূম: রামপুরহাটে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা প্রাক্তন বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে (Ashish Banerjee Death) ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বাড়ির লাগোয়া একটি পার্টি অফিস (Party Office) থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। কী কারণে তিনি এমন চরম সিদ্ধান্ত নিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। তিনি স্বাভাবিকই ছিলেন। এমনকী স্বাধীনতা দিবসের দিনও তিনি পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এরপর আচমকা কী ঘটল, তা বুঝে উঠতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।
তবে ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট (Suicide Note) উদ্ধার হয়েছে। সেই নোট ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। পুলিশ সূত্রে খবর, চিঠিতে রাজনৈতিক জীবন, দলের ভিতরের অন্যায় এবং দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে সরাসরি দায়ী করেননি তিনি।
কী লেখা রয়েছে সুইসাইড নোটে?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সুইসাইড নোটে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা লিখেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, জীবনে কখনও দুর্নীতির সঙ্গে আপস করেননি। কোনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি এবং কারও কাছ থেকে কোনও টাকা নেননি।
চিঠিতে ছাত্র-ছাত্রীদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানোর কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে একইসঙ্গে নিজের আক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, চোখের সামনে দলের ভিতরে অন্যায় হতে দেখেও সবসময় তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেননি।
TRDA-র দুর্নীতির প্রসঙ্গ
তারাপীঠ রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (TRDA)-কে ঘিরে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। সুইসাইড নোটে সেই প্রসঙ্গও এসেছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
নিজের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “TRDA-তে জেনারেল মিটিং ছাড়া আমার আর কোনও দায়িত্ব ছিল না। আমি টেন্ডার কমিটির সদস্য ছিলাম না। চেক পাওয়ারের দায়িত্বও আমার ছিল না। প্ল্যান পাস করা বা NOC দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমার কোনও ভূমিকা ছিল না। এই বিষয়ে আমার সঙ্গে কখনও কেউ আলোচনা করেনি।”
এরপর নিজের অপমানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি লিখেছেন, “যেভাবে আমাকে অপমান করা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে রাজনীতিতে আসাটাই হয়তো আমার ভুল ছিল। পরিবারের কেউ যেন ভবিষ্যতে রাজনীতিতে না আসে, সেই পরামর্শও দিয়ে যাচ্ছি।”
কী বলছেন অনুব্রত মণ্ডল?
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন অনুব্রত মণ্ডল। তিনি বলেন, “আশিস খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে তাঁর কোনও বিবাদ ছিল না। কোনও ঝামেলার মধ্যেও থাকতেন না। অত্যন্ত সৎ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ ছিল না। পরিবারেও কোনও সমস্যা ছিল বলে আমার জানা নেই। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সত্যিই বুঝতে পারছি না।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ধ্রুব সাহার
রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা এই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “রাজনীতিতে কে কোথায় অপমানিত হয়েছেন, সেটা আমি বলতে পারব না। তবে বিজেপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়ার পরও আমি আশিসবাবুর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে প্রণাম করেছিলাম। যদি কোনও অপমান হয়ে থাকে, তাহলে সেটা তাঁর নিজের দলের কাছ থেকেই হয়ে থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “বাড়িতেও তিনি কোনও সমস্যার মধ্যে ছিলেন কি না, কে তাঁকে বিরক্ত করত বা কারও কাছ থেকে চাপ ছিল কি না, সবকিছুই তদন্ত করে দেখা দরকার। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। তাই এই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
কুণাল ঘোষের দাবি
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও এই ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কুণাল ঘোষ বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি আশিসবাবুর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তিনি আদৌ কোনও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন কি না, সেটা তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়। কিন্তু প্রমাণের আগেই যদি কাউকে কলঙ্ক, অপমান বা কুৎসার মাধ্যমে মানুষের সামনে দোষী হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেই মানসিক চাপ একজন মানুষ কতটা নিতে পারেন, সেটাও ভাবার বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “কিছুদিন আগেই ২১ জুলাইয়ের সভায় যাওয়ার সময় আশিসবাবুকে রাস্তায় এক বিজেপি নেতা অত্যন্ত খারাপ ভাষায় অপমান করেছিলেন। কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই এভাবে একজনকে প্রকাশ্যে হেয় করা হলে তার প্রভাব পড়তেই পারে। সেই বিষয়টিও তদন্তে দেখা উচিত। আর দলের ভিতরে অন্যায় দেখেও কেন তিনি প্রতিবাদ করতে পারেননি, সেটা অবশ্যই আলাদা করে খতিয়ে দেখা দরকার।”
সব মিলিয়ে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে দলের কথা, দুর্নীতির অভিযোগ, TRDA-তে তাঁর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক জীবনে অপমানের প্রসঙ্গ উঠে আসায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।


