লখনউ: রামমন্দিরে দানের টাকা তছরুপের অভিযোগ (Ram Mandir donation controversy) নিঃসন্দেহে গুরুতর। তদন্তে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তারির ঘটনা ঘটেছে, নগদ গোনার কাজে যুক্ত আরও কয়েকজনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে এই অভিযোগকে সামনে রেখে বিরোধীদের সরব হওয়া রাজনৈতিক ভাবে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের ২০২৭-এর বিধানসভা ভোটের আগে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়, এই ইস্যুতে বিরোধীরা যত বেশি সময় দেবে, ততটাই কি সুবিধা হবে বিজেপির?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সবচেয়ে পরীক্ষিত রাজনৈতিক জমি হল হিন্দুত্ব। অযোধ্যা, রামজন্মভূমি এবং রামমন্দির সেই রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রতীক। ফলে বিরোধীরা যদি চাঁদা তছরুপের অভিযোগকে (Ram Mandir donation controversy) শুধুমাত্র ‘রামের ঘরে চুরি’ বনাম ‘রামভক্তদের আবেগ’, এই দ্বিমেরু বিতর্কে পরিণত করে, তাহলে ভোটের আলোচনাও সেই পরিচিত পরিসরে ফিরে যেতে পারে।
বিজেপির জন্য ‘স্বস্তির ইস্যু’ কেন?
উত্তরপ্রদেশের ভোটে বিজেপিকে যে বিষয়গুলিতে অস্বস্তিতে ফেলা সম্ভব, তার মধ্যে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের আয়, শিক্ষা, প্রশ্নফাঁস এবং সরকারি পরিষেবার মতো জনজীবনের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীরা যদি ধারাবাহিক ভাবে এই বিষয়গুলির বদলে রামমন্দিরকেন্দ্রিক (Ram Mandir donation controversy) বিতর্কে বেশি সময় ব্যয় করে, তাহলে রাজনৈতিক আলোচনার ফোকাস বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জায়গাতেই ক্রিকেটের ‘হোম পিচ’-এর উদাহরণটি প্রাসঙ্গিক। হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদ, বিজেপির দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক অস্ত্র। সেই ইস্যুতেই সরাসরি লড়াই করা মানে অনেকটা প্রতিপক্ষের শক্তিশালী মাঠে খেলতে নামা।
যোগী সরকারের পাল্টা কৌশলও তৈরি
চাঁদার টাকা নিয়ে অভিযোগকে বিরোধীরা যতই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করুক, বিজেপি ও যোগী সরকার পাল্টা বলতে পারে, অভিযোগ সামনে আসার পর প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে, তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, বিরোধীদের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে শাসক শিবিরের কাছেও তৈরি হচ্ছে পাল্টা বয়ান, ‘রামের ঘরে চুরি হলে সরকার চুপ করে বসে নেই।’ ফলে দুর্নীতির অভিযোগটি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নে আটকে না থেকে ফের রামমন্দির ও ধর্মীয় আবেগের পরিসরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অখিলেশের চ্যালেঞ্জ বনাম বিজেপির ‘রাম-অঙ্ক’
বর্তমানে অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন সমাজবাদী পার্টি উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সামনে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে বিরোধীদের সামনে বড় প্রশ্ন হল, কোন ইস্যুতে বিজেপিকে আক্রমণ করলে তাদের রাজনৈতিক চাপ সবচেয়ে বেশি বাড়ানো সম্ভব?
বিহারের নির্বাচনের প্রসঙ্গও এখানে টেনে আনছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের যুক্তি, ভোটচুরি নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার প্রচারে অন্য জনজীবনের ইস্যু কিছুটা পিছনে চলে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে উত্তরপ্রদেশে বিরোধীরা কী কৌশল নেবে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
অযোধ্যার বাইরে কতটা প্রভাব?
আর একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। রামমন্দিরের দানের টাকা তছরুপের (Ram Mandir donation controversy) অভিযোগ অযোধ্যা এবং সংলগ্ন এলাকায় স্বাভাবিক ভাবেই বেশি আবেগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু গোটা উত্তরপ্রদেশে এই ইস্যুর প্রভাব কতটা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
তাই বিরোধীরা চাইলে এই অভিযোগকে দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে পারে, যেখানে ধর্মীয় আবেগের বদলে অর্থের হিসাব, প্রশাসনিক দায় এবং তদন্তের স্বচ্ছতা সামনে থাকবে। আবার যদি সেটি মূলত ধর্মীয় আবেগের লড়াই হয়ে ওঠে, তাহলে বিজেপির পরিচিত রাজনৈতিক বৃত্তেই বিতর্ক ঘুরতে পারে।
আসল লড়াইটা তাই ইস্যু বাছার
বিরোধীদের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে রামমন্দিরের (Ram Mandir donation controversy) মতো প্রতীকী ও আবেগঘন ইস্যুতে বিজেপিকে আক্রমণ করার সুযোগ, অন্যদিকে সেই আক্রমণই যাতে বিজেপিকে নিজের শক্তিশালী রাজনৈতিক জমিতে খেলতে না দেয়, সেই সতর্কতা। ২০২৭-এর ভোট এখনও দূরে। কিন্তু তার আগেই একটি বিষয় স্পষ্ট! রামমন্দিরের চাঁদা-তছরুপের অভিযোগ শুধু দুর্নীতির তদন্তের বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠতে পারে ইস্যু বাছাইয়ের রাজনৈতিক পরীক্ষাও।
শেষ পর্যন্ত বিরোধীরা কি রামমন্দিরের ইস্যুতেই (Ram Mandir donation controversy) বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করবে, নাকি সেই অভিযোগকে সামনে রেখেও বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষক ও চাকরির মতো প্রশ্নকে ভোটের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখবে? উত্তরপ্রদেশের ২০২৭-এর লড়াইয়ে এই কৌশলগত সিদ্ধান্তই হয়তো ঠিক করে দিতে পারে, কে কাকে ‘হোম পিচে’ খেলাচ্ছে।


