লখনউ: ঠিক যেন ২০২২-এর বিলকিস বানো ঘটনার পুনরাবৃত্তি! কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থা মামালায় ‘বেকসুর খালাস’ ব্রিজভূষণকে (Brij Bhushan Sharan Singh) ‘গ্র্যান্ড ওয়েলকাম’ জানালো রামনগরী! ২০২৩ সালে দেশের কুস্তি জগতে যে বিস্ফোরক অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় হয়েছিল রাজধানী, সেই মামলায় আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস পাওয়ার পর প্রথমবার অযোধ্যায় পা রাখলেন ব্রিজভূষণ শরণ সিং। আর তাঁর প্রত্যাবর্তন যেন হয়ে উঠল একেবারে শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ।
বিমানবন্দরে ঢাকঢোল, তারপর হুডখোলা গাড়িতে রোড শো। রাস্তার দু’ধারে ভিড়। কোথাও আতশবাজি, কোথাও পুষ্পবৃষ্টি। আর বারবার উঠল একই স্লোগান, ‘শের আয়া’। যৌন হেনস্তার অভিযোগে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস করেছে। কিন্তু সেই রায়ের পর অযোধ্যায় যে ভাবে তাঁকে (Brij Bhushan Sharan Singh) স্বাগত জানানো হল, তা ঘিরেই নতুন করে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌতূহল।
২০২৩ সালে ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনেন ছ’জন মহিলা কুস্তিগির। তাঁদের মধ্যে দেশের প্রথম সারির কুস্তিগিররাও ছিলেন। দিল্লির লালকেল্লার সামনে শুরু হয় ধর্না। বিচার চেয়ে রাস্তায় নামেন কুস্তিগিররা।
ধর্নাস্থল থেকেই অলিম্পিকের প্রস্তুতি চালিয়ে যান ভিনেশ ফোগাট। পরে অলিম্পিকের ফাইনালেও ওঠেন তিনি। চলতি বছর মে মাসে ভিনেশ প্রকাশ্যে দাবি করেন, অভিযোগকারী ছ’জন মহিলা কুস্তিগিরের মধ্যে তিনিও ছিলেন। অভিযোগের রাজনৈতিক অভিঘাতও ছিল যথেষ্ট। কারণ, সেই সময় ব্রিজভূষণ ছিলেন বিজেপির সাংসদ এবং কুস্তি ফেডারেশনের শীর্ষ পদে।
আদালতে কী হল?
শেষ পর্যন্ত আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, মামলায় পেশ করা প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। সেই কারণেই ব্রিজভূষণ শরণ সিং (Brij Bhushan Sharan Singh) এবং বিনোদ তোমর, দু’জনকেই বেকসুর খালাস করা হয়।
রায়ের পর আদালত চত্বরেই ব্রিজভূষণ বলেন, তিনি শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, আদালতের রায়ে তিনি খালাস পেয়েছেন এবং এখন তিনি মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আইনি বিচারে এই রায় তাঁর জন্য নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তি। কিন্তু জনপরিসরে বিতর্কটি এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। আর তারপরই অযোধ্যায় ‘শের’-এর প্রত্যাবর্তন খালাসের পর প্রথমবার অযোধ্যায়। আর সেই সফরকে ঘিরেই যেন অন্য ছবি।
বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে ভিড়। তারপর হুডখোলা গাড়িতে রোড শো করে গোন্ডার দিকে রওনা। পথে জমে ওঠে জনসমাগম। আতশবাজি, পুষ্পবৃষ্টি এবং স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাস্তা। স্লোগান, ‘শের আয়া’। শুধু রোড শো নয়, হনুমানগড়ি মন্দিরের বাইরেই প্রার্থনা করেন ব্রিজভূষণ। এরপর যোগ দেন ‘সত্যমেব জয়তে’ র্যালিতে। পুরো সফরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুত্র তথা বিজেপি সাংসদ করণভূষণ। তাঁর বক্তব্য, ব্রিজভূষণের খালাস আসলে সত্যের জয়।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়
ব্রিজভূষণ আদালতে খালাস পেয়েছেন! এটাই আইনি বাস্তবতা। কিন্তু একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া এবং অভিযোগ ঘিরে তৈরি সামাজিক বিতর্ক, এই দু’টি বিষয় এক নয়। তাই অযোধ্যার এই বিপুল স্বাগত নতুন প্রশ্নও তুলছে। আইনি লড়াইয়ে মুক্তির পর কি ব্রিজভূষণ (Brij Bhushan Sharan Singh) এবার রাজনৈতিকভাবে নিজের হারানো জায়গা পুনরুদ্ধারের বার্তা দিতে চাইছেন? ‘শের আয়া’ স্লোগান, হুডখোলা গাড়িতে রোড শো, জনসমাগম! সব মিলিয়ে সফরটি নিছক ব্যক্তিগত ধর্মীয় সফর ছিল, নাকি তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনেরও ইঙ্গিত?
বিশেষ করে তাঁর পাশে যখন রয়েছেন বিজেপি সাংসদ পুত্র, তখন সেই প্রশ্ন আরও জোরালো। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ২০২৩-এর বিতর্ক, দীর্ঘ আন্দোলন এবং আদালতের রায়ের পর ব্রিজভূষণকে ঘিরে যে রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল, অযোধ্যার এই ‘শের আয়া’ মুহূর্তে তা যেন ফের আলোচনার কেন্দ্রে। আদালতে খালাস, তারপর অযোধ্যায় বীরের বরণ। এবার কি ব্রিজভূষণের (Brij Bhushan Sharan Singh) পরবর্তী রাজনৈতিক ইনিংসের মঞ্চও তৈরি হচ্ছে?


