Aaj India Desk, কলকাতা: এবার উজাড় হতে চলেছে মধ্যপ্রদেশের সিংগ্ৰাউলি জঙ্গল (Singrauli Forest)। সেখানে নামতে চলেছে বুলডোজার (Bulldozer)। জঙ্গল কেটে তৈরি হবে আদানি গোষ্ঠী (Adani Group)-র ধীরাউলি কয়লা খনি (Dhirauli Coal Mine) । এই খনি তৈরির জন্য প্রায় ১,৩৯৭ হেক্টর (প্রায় ৩,৫০০ একর) ঘন চিরহরিৎ বনভূমি ধ্বংস করা হবে এবং প্রায় ৬ লক্ষ গাছ কাটা পড়বে। এছাড়াও, চিতা, স্লথ ভাল্লুক, বুনো কুকুর, নীলগাই, পেঁচা ও শকুন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রদেশ-ছত্রিশগড় সীমান্তে হাতিদের চলাচলের রাস্তা বা এলিফ্যান্ট করিডর- সবই বিপদের মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ৪৫০০-এরও বেশি বনবাসী আদিবাসী মানুষ। অভিযোগ, কেন্দ্র সরকার ও আদানি গোষ্ঠীর নির্দেশেই এগোচ্ছে এই প্রকল্প। আর সেই ধ্বংসযজ্ঞের পথকেই কার্যত আরও সহজ করে দিল দেশের শীর্ষ আদালত, অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত।
বছর তিনেক আগেই আদানি গোষ্ঠীকে ধীরাউলি কয়লা খনি সম্প্রসারণের অনুমোদন দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। যে প্রকল্পের আনুমানিক খরচ প্রায় ২৮০০ কোটি টাকা। বছরে অন্তত ৬৫ লাখ টন কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কয়লা খননের অনুমতি দেয় কয়লা মন্ত্রক। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিলেন পরিবেশ কর্মী অজয় দুবে। তাঁর দাবি ছিল, এই অঞ্চলে কয়লা খনি হলে ব্যাপক ক্ষতি হবে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের। মামলার শুনানিতে গ্রিন ট্রাইব্যুনাল জানায়, নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে মামলা করা হয়েছে, তাই আপাতত তা খারিজ করা হচ্ছে। কিন্তু অজয় দুবে থেমে থাকেননি। তিনি সুপ্রিম কোর্টে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানান। মামলায় তিনি মূলত তিনটি বিষয় তুলে ধরেন-
১. কয়লা খনি হলে ওই অঞ্চলের এলিফ্যান্ট করিডর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২. কয়লা খনির বিষয়টি সাধারণ মানুষের সামনে পর্যাপ্তভাবে তুলে ধরা হয়নি।
৩. এই এলাকা একসময় যেকোনও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও অজয়ের মামলাকে আংশিকভাবে খারিজ করে দেয়। ফলে জঙ্গল কেটে কয়লা খনি তৈরির পথ আরও প্রশস্ত হয়ে যায়।
এই ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের মধ্যে গড়ে উঠেছে আদানি গোষ্ঠীর একাধিক কয়লা খনি। বিশেষ করে ছত্রিশগড়ের হাসদেও অরণ্য, গাড়ে পেলমা অঞ্চল, ওড়িশার তালাবিরা এলাকা, ঝাড়খণ্ডের গোন্দলপুরা অঞ্চল- যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে বিজেপি সরকারের আমলে কয়লা খনির নামে দেশের প্রায় ৫০,০০০ একর অরণ্য দখল করেছে আদানি গোষ্ঠী। এর মধ্যে অন্তত ৩০ হাজার একর এলাকায় প্রকল্প চালু হয়েছে, কাটা পড়েছে লক্ষ লক্ষ গাছ। উচ্ছেদ হয়েছেন হাজার হাজার বননির্ভর মানুষ। কোথাও কোথাও এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ, সেই আন্দোলনগুলিকে দমন করারও চেষ্টা চালিয়েছে কেন্দ্র সরকার। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় আদানির বিভিন্ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদে সরব হলেও, ডবল ইঞ্জিন সরকারের তরফে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আদানি গোষ্ঠীর কর্ণধার গৌতম আদানির সম্পত্তির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ১৩ গুণ বৃদ্ধি। কোন সরকারের আমলে এই বৃদ্ধি ঘটেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছেই। দেশের নানা প্রান্তে একের পর এক বড় প্রকল্প কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছে আদানি গোষ্ঠীর হাতে। কয়লাখনি, বন্দর, বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার- তালিকা দীর্ঘ। এমনকি নিকোবর অরণ্য ধ্বংস করে যে সাম্প্রতিক প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার দায়িত্বও গিয়েছে আদানি গোষ্ঠীর কাছেই।
ফলে বিরোধীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন যে, উন্নয়নের নামে কি ধীরে ধীরে দেশের বনভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে? উন্নয়নের নামে কি এভাবেই ভিটেমাটি ছাড়া করা হবে হাজার হাজার বনবাসী মানুষকে?


