দেবী ভট্টাচার্য: ২০২৪-এর আগস্ট-ছাত্র আন্দোলনে যে ‘নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন’ দেখেছিলেন বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু, উদারপন্থী আমজনতা, শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) দেশত্যাগের সাথে সাথেই সেই স্বপ্ন কার্যত ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আওয়ামী-সরকার পতনের পর মৌলবাদী (Islamist), সমাজবিরোধীদের দখলে চলে যায় ওপার বাংলা (Bangladesh)। তারপর থেকে আগুন জ্বলছেই, মরছে হিন্দুরা, মুখ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন উদারপন্থী বাংলাদেশীরা।
এখন নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের (Bangladesh) স্বাধীনতার বিরোধিতার অভিযোগে সমালোচিত এবং এক দশকেরও বেশি সময় নির্বাচনী রাজনীতি থেকে ব্রাত্য থাকা দেশের সবচেয়ে বড় “মৌলবাদী” (Islamist) দলটি ফের নতুন রূপে সামনে আসছে। ফেব্রুয়ারিতে সংসদীয় নির্বাচনের আগে দলটির এই পুনর্গঠন ও বাড়তে থাকা জনসমর্থন মধ্যপন্থী মহল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ১৭ কোটি ৫০ লক্ষ জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে (Bangladesh) ছাত্র আন্দোলনের পর থেকেই নিজেদের ভাবমূর্তি বদলাতে শুরু করে জামাত-ই-ইসলামি (Jamaat-E-Islami)। হাসিনার দল আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানকে সামনে রেখে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনে সর্বকালের সেরা ফলের আশায় মাঠে নেমেছে জামাত।
মার্কিন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের এক সমীক্ষায় জামাতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘পছন্দের’ দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (BNP)-র প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
“পরের দিনের সকাল দেখতে পাব কিনা, আতঙ্ক হয়”
শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) দেশ ছাড়ার পর থেকে হিন্দু-হত্যা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, হিন্দু মন্দির ও সুফি দরগায় হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে। এমনকি ছাড় পায়নি আধ্যাত্মিক লোকসংগীত শিল্পীদের পরিবেশনা থেকে শুরু করে নারী ফুটবল ম্যাচ। প্রকাশ্যে এই ঘটনাগুলির নিন্দা করলেও, সংখ্যালঘু ও উদারপন্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে কার্যত হাত গুটিয়েই রয়েছে ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলাদেশে (Bangladesh) সংখ্যালঘুদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা। মত জনসংখ্যার তাঁরা প্রায় ৮ শতাংশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতার কথায়, “বাংলাদেশের কোনও সরকারই আমাদের সুরক্ষা দিতে পারেনি। কিন্তু এখন যে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি, তা আগে কখনও হয়নি। পরের দিনের সকালটা দেখতে পাব কিনা আশঙ্কা হয়।”
তবে জামাতের এই উত্থান থেকে আরও বেশি সিঁদুরে মেঘ দেখছে বাংলাদেশের হিন্দুরা। ওই সংখ্যালঘু নেতার আশঙ্কা, “জামাত (Jamaat-E-Islami) ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের দিকে এগোনর সম্ভাবনা বেশি। নিজের পাশাপাশি, সাড়া দেশের সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়”।
“নতুন কিছু” চাইছে বাংলাদেশ
রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত বাজারে এক ডাব বিক্রেতা ৪০ বছরের মহম্মদ জালাল বলেন, “আমরা নতুন কিছু চাইছি, আর সেটা জামাত (Jamaat-E-Islami)। ওদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার, দেশের জন্য কাজ করে”। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্বের ইতিহাসকে কার্যত মলিন করে দিয়েছিল আওয়ামী লিগের অন্তিম পর্যায়ের কর্তৃত্ববাদী শাসন।
নির্বাচনী কারচুপি, মূল্যবৃদ্ধি সহ সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল ‘সংরক্ষণ’। সেই সুযোগকে এবার কাজে লাগিয়ে ‘ইসলামই সমাধান’ স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশে (Bangladesh) নিজেদের মাটি শক্ত করতে চাইছে জামাত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম তাঁরা হিন্দু প্রার্থী মনোনীত করেছে। সাম্প্রতিককালে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধেও তারা মুখ খুলেছে। যা থেকে জামাত যে তাঁদের ‘কট্টর মৌলবাদী’ ভাবমূর্তিকে সরিয়ে নৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে তা স্পষ্ট।


