Aaj India Desk, নয়াদিল্লি: কুকুরের কামড়ের (Dog bite) পর জলাতঙ্কে (Rabies) মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, যে কুকুর কামড়েছে সেটিকে টিকা (Vaccine) দেওয়া ছিল। তারপরও আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন এক গবেষণায় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায় হিসেবে কুকুরের ব্যাপক টিকাকরণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, শিশুদের নিয়মিত আগাম জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার পরিবর্তে কোনও এলাকার অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনা গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষের মধ্যে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষ কোনও না কোনও প্রাণীর কামড়ের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ৭৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে কামড়ের জন্য দায়ী কুকুর। দেশে প্রতি বছর জলাতঙ্কে প্রায় ৫,৭২৬ জনের মৃত্যু হয় বলে ওই হিসাব। বিশ্বজুড়ে এই রোগে বছরে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।
জলাতঙ্কের উপসর্গ একবার দেখা দিলে রোগটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রাণঘাতী। তবে কুকুর বা অন্য কোনও প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। কেরলে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ বিনামূল্যে কামড়ের পর জলাতঙ্ক প্রতিরোধের চিকিৎসা পান। সেখানে চিকিৎসার পুরো কোর্স শেষ করার হারও দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় বেশি। তা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে কেরলে জলাতঙ্কে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে শিশুও ছিল।
‘দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ’-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কেরলে জলাতঙ্ক রুখতে বিভিন্ন পদ্ধতি কতটা কার্যকর হতে পারে, তা গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের নিয়মিত আগাম জলাতঙ্কের টিকা দিলে সুফল তুলনামূলক ভাবে কম। ১০ বছরে গড়ে ১০টিরও কম মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। অথচ এই কর্মসূচিতে খরচ অনেক বেশি।
অন্যদিকে, কোনও এলাকার অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে প্রায় তিন বছরের মধ্যেই মানুষের মধ্যে জলাতঙ্কে মৃত্যু প্রায় শূন্যে নামতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের মডেল আরও দেখিয়েছে, শিশুদের আগাম টিকাকরণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে গিয়ে যদি কুকুরের টিকাকরণ কমে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সেক্ষেত্রে ১০ বছরে ৪৮৮টি পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
কুকুরের টিকাকরণের পাশাপাশি কামড়ের পর মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে গবেষণায়। বর্তমানে ভারতে কুকুর কামড়ানোর পর চার দফায় যে প্রতিষেধক দেওয়ার পদ্ধতি চালু রয়েছে, তার বদলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা গেলে চিকিৎসার কার্যকারিতা বজায় রেখেই খরচ কমানো সম্ভব বলে গবেষকদের দাবি।
তবে শুধু টিকা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। কারণ সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া বা চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করাই জলাতঙ্কে মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। সরকারি হিসাবের তুলনায় বাস্তবে কুকুরের সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে যে সংখ্যক কুকুরকে টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম।
গবেষকদের পরামর্শ, ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষের মধ্যে জলাতঙ্কে মৃত্যু বন্ধ করতে হলে কুকুরের ব্যাপক টিকাকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্ষিপ্ত প্রতিষেধক পদ্ধতি চালু করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।


