Aaj India Desk, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন (Assembly Election)-এর প্রথম দফার ভোটে রাজ্যজুড়ে একদিকে ইভিএম (EVM) বিভ্রাট, বিক্ষোভ, হামলা ও মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে, অন্যদিকে দিনের শেষে রেকর্ড ভোট (Vote) দানের নজির গড়েছে বাংলা। উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল, শিল্পাঞ্চল থেকে পূর্ব মেদিনীপুর-বিভিন্ন জেলায় দিনভর উত্তেজনা ও অভিযোগের মধ্যেই ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সকাল থেকেই একাধিক জেলায় ইভিএম বিভ্রাট, ভোটে দেরি
ভোট শুরুর পর থেকেই রাজ্যের একাধিক বুথে ইভিএম খারাপ, ব্যাটারি না থাকা, মেশিন বদল, ইলেকট্রিসিটির অব্যবস্থা এবং ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকার অভিযোগ ওঠে। যে সমস্ত জায়গার ভোটারদের এই সমস্ত যান্ত্রিক গোলযোগ ও অব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয় সেগুলি হল-
1.শিলিগুড়ির রামকৃষ্ণ পাঠশালা ও জগদীশ হাই স্কুলে ইভিএম বিকল হওয়ায় মকপোল বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন মেশিন এনে ভোট শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
2.বাঁকুড়ার সারদামণি মহিলা কলেজে নির্দিষ্ট সময়ে ভোট শুরু হয়নি। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ভোটারদের।
3.আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে তৃণমূল প্রার্থী রাজীব তির্কি আঙুলে কালি লাগানোর পরও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভোট দিতে পারেননি।
4.কোচবিহার উত্তরের ৬টি বুথে সকাল ১০টা পর্যন্ত ভোট সাময়িক বন্ধ ছিল। মেখলিগঞ্জের একটি বুথে তিনবার ইভিএম বদলাতে হয়।
5.মালদহের হবিবপুরে দু’বার ইভিএম বিকল হয়।
6.দুর্গাপুর পশ্চিমের ১৬৫ নম্বর বুথে ব্যাটারি না থাকায় মকপোল শুরু করা যায়নি।
7.ধুপগুড়িতেও ইভিএম মেশিন বিকল হয়ে ভোটগ্রহণে দেরি হয় এবং ভোটারদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
এছাড়াও, নন্দীগ্রাম, বড়ঞা ও খয়রাশোলের কয়েকটি বুথে অভিযোগ ওঠে, তৃণমূলকে ভোট দিলে ভোট বিজেপিতে পড়ছে। এর জেরে বিক্ষোভ শুরু হয়।
উল্লেখ্য, আসানসোলের জামুরিয়ায় গভীর রাতে একটি স্করপিও গাড়ির ভিতরে একাধিক ইভিএম পড়ে থাকতে দেখা যায় যার ফলে এলাকায় তুমুল চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সিপিএম ও এনসিপি প্রার্থীরা বিক্ষোভ দেখান। যদিও সেক্টর অফিসারের দাবি ছিল, সেগুলি রিজার্ভ ইভিএম ছিল। পরে আধাসামরিক বাহিনী এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
অসন্তোষ, সংঘর্ষ, হামলা, বুথ জ্যাম ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
এইবার নির্বাচন কমিশন ভোট প্রক্রিয়া সুস্থভাবে সম্পন্ন হওয়ার ইঙ্গিত তুলে ধরলেও সকাল থেকে লাগাতার অসন্তোষের ছবিও কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল না। যে যে জায়গায় অসন্তোষের ছবি ফুটে ওঠে সেগুলি হল-
দক্ষিণ কাঁথির বেতালিয়া বুথে ভোটের আগের রাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ঢোকার অভিযোগ ওঠে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে।একজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন এলাকাবাসী।
মুর্শিদাবাদের নওদায় ভোটের আগের রাতে বোমাবাজিতে এক মহিলা আহত হন। একই এলাকায় এজেন্টকে বসতে বাধা দেওয়া নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়।
মেদিনীপুর, উত্তর কাঁথি, গঙ্গারামপুর, তুফানগঞ্জ, ডোমকল ও গোয়ালপোখরে বুথের বাইরে জটলা, ভোটারদের প্রভাবিত করা, প্রার্থীকে আটকে রাখা, বুথ জ্যাম ও রোড জ্যামের অভিযোগ ওঠে।
রামনগর, নানুর, নারায়ণগড়, কোতুলপুর ও ইন্দাসে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তৃণমূল ও সিপিএম কর্মীদের মারধর, ক্যাম্প ভাঙচুর ও হেনস্থার অভিযোগ ওঠে।
লাভপুর, চাঁচল, পটাশপুর, কুমারগঞ্জ, বহরমপুর ও নন্দীগ্রামে বিজেপি, কংগ্রেস ও নির্দল প্রার্থীর এজেন্ট বা কর্মীদের মারধরের অভিযোগ সামনে আসে।
আসানসোল দক্ষিণে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে।
এছাড়াও, পিংলার ৯ নম্বর বুথে সব ভোটকর্মী একসঙ্গে লাঞ্চে যাওয়ায় কমিশন প্রিসাইডিং অফিসার-সহ সবাইকে সাসপেন্ড করে।
এছাড়াও, মালদহের গাজোলের ২২৯ নম্বর বুথে ভোট দিতে গিয়ে রিক্তা মণ্ডল বিশ্বাস জানতে পারেন, তাঁর ভোট নাকি আগেই পোস্টাল ব্যালটে পড়ে গিয়েছে।
ভোটের মাঝেও মৃত্যু
ইভিএম মেশিন খারাপ, যান্ত্রিক গোলযোগ, অসন্তোষ এবং মারপিটের চিত্র যেমন সামনে এসেছে ঠিক তেমনি বেশ কিছু জায়গায় একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আছে। যেমন-
পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের ২৩৪ নম্বর বামুনবাড় বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ৬২ বছরের বিজেপি কর্মী নিপেন্দ্রনাথ দাসের মৃত্যু হয়।
পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পর অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় ইসরাতন বিবির। পরিবারের দাবি, ভোটার তালিকায় পরিবারের সদস্যদের নাম না থাকায় তিনি মানসিক চাপে ছিলেন।
বীরভূমের সিউড়িতে ভোট দিতে যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে মারা যান অসীম রায় (৬৬)। জানা গিয়েছে, আগে থেকেই তাঁর শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল।
সবশেষে রেকর্ড ভোটদান, খুশি কমিশন
দিনভর নানা অভিযোগ ও উত্তেজনার মাঝেও বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে মোট ভোটদানের হার পৌঁছয় ৯০ শতাংশে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, ২০১১ সালের আগের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে ২০২৬ সালে সর্বাধিক ভোট পড়েছে।
কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত জানান, বড় ধরনের কোনও অশান্তি ঘটেনি। কন্ট্রোল রুমে আসা প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভোট পর্যবেক্ষণে ২০০ জন মাইক্রো-অবজারভার মাঠে ছিলেন। এখনও পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, “গত ৫০ বছরের মধ্যে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে কম হিংসার নির্বাচন।”


