36 C
Kolkata
Friday, April 3, 2026
spot_img

হোয়াটসঅ্যাপ ভোট: মেসেজে বদলাচ্ছে মন? ডিজিটাল প্রচারণার নেপথ্যে চলছে অন্য খেলা !

         SPECIAL FEATURE 

স্নেহা পাল, কলকাতা : ভোটের মরশুমে চায়ের দোকানে বা পাড়ার রকে আলোচনা বোধহয় আমাদের সকলের কাছেই খুব পরিচিত দৃশ্য। তবে এখন সেই আলোচনা সরাসরি আপলোড হয় ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে’। এখানে ডিগ্রি না থাকলেও মতামত থাকে পিএইচডি লেভেলের! এই পরিস্থিতিতে আসন্ন বিধানসভা ভোট প্রচারের নতুন মঞ্চ যে হবে স্মার্টফোনের স্ক্রিন, সেটাই তো স্বাভাবিক। (WhatsApp vote)

ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফরোয়ার্ড মেসেজ এবং ভাইরাল ভিডিও, সব মিলিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভোটারদের মন জয় করার এক অদৃশ্য লড়াই চলছে। বিশেষ করে প্রথমবারের স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ভোটারদের মধ্যে এই প্রভাব যে কতটা গভীর সেটা আন্দাজ করতে পারেন আপনারাই।

হোয়াটসঅ্যাপ কেন ভোটের মাঠে শক্তিশালী?

ভারতে ওয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারকারী সংখ্যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। শত শত রাজ্য ও জেলায় রাজনৈতিক দলগুলো লক্ষ লক্ষ গ্রুপ তৈরি করে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ভোটার তালিকা ও ফোন নম্বরের ভিত্তিতে বয়স, অঞ্চল ও পেশা অনুসারে গ্রুপ তৈরি হয়। ফলে একটি মেসেজ মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। (WhatsApp vote)

ভাইরাল ফরওয়ার্ডের ছড়াছড়ি

নির্বাচনের সময় প্রায়ই দেখা যায় ছবি বা ভিডিও যেখানে কোনো নেতার মুখ বদলে দেওয়া হয়েছে বা পুরনো ঘটনা নতুন করে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিছু মেসেজে দাবি করা হয় কোনো দল বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করছে বা ভোটারদের জন্য ‘গোপন সুবিধা’ রাখছে। এসব ফরওয়ার্ড প্রায়শই ‘ফরওয়ার্ডেড মেনি টাইমস’ লেবেলযুক্ত হয়, যা ছড়ানোর গতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রথমবারের ভোটারদের অভিজ্ঞতা

কলকাতার আশেপাশে ১৮ বছর বয়সী ভোটার অর্থাৎ যাঁরা এবারই প্রথম ভোট দেবেন, তাঁরা জানান যে প্রায়শই গেম থেকে শুরু করে ইউটিউবে ভিডিও, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে শাসক দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ‘বিজ্ঞাপন’ দেখা যাচ্ছে। প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি করে এই ধরনের বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হচ্ছে সাধারণ ধারণা। পাশাপাশি “মাছ মাংস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে” , হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ, এডিট করা ছবি, ভিডিও সহ নানান ধরনের অপ্রীতিকর মেসেজ ফরোয়ার্ড পান তাঁরা। একইভাবে গ্রামীণ এলাকার প্রথমবারের ভোটাররা জানান, পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে গ্রুপে থাকায় একজনের ফরওয়ার্ড সবাই দেখেন। যাচাই করার অভ্যাস কম বলে সেইসব মেসেজ সহজেই বিশ্বাস করে নেন তাঁরা।

ফেক নিউজ বনাম আসল প্রভাব

এখানে ব্যাপারটা একটু হাস্যকর। কল্পনা করুন, একটা মেসেজ এলো যেখানে বলা হলো ‘যদি এই দলে ভোট দেন তাহলে আপনার এলাকায় ফ্রি ওয়াইফাই আর সোনার ডিম পাড়া মুরগি আসবে!’ কেউ কেউ হেসে উড়িয়ে দেবেন, কিন্তু অনেকেই এই কথাটিও বিশ্বাস করে নেন। এই ‘ডিজিটাল জাদু’র কারণে ভোটারদের মধ্যে একধরনের ইকো চেম্বার তৈরি হয়। একই মতের মেসেজ বারবার আসায় মনে হয় সেটাই সত্যি। কিন্তু বাস্তবে এসবের প্রভাব কতটা? গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে এআই-জেনারেটেড ডিপফেক ভিডিও ও ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভোটারদের মতামত ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাবিত হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়। তবে সব মেসেজই ফেক নয়,কিছু সত্যি তথ্যও ছড়ায়, যা ভোটারদের সচেতন করে।

রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বীকার করে যে ওয়াটসঅ্যাপ তাদের কাছে সস্তা ও কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু এর অপব্যবহার রোধে ওয়াটসঅ্যাপ নিজেই ফরওয়ার্ড লিমিট চালু করেছে। ভারতে ফ্যাক্ট-চেকিং হেল্পলাইন চালু হয়েছে। এদিকে, নির্বাচন (Election) কমিশন এবং বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা এই ধরনের বিভ্রান্তি রুখতে উদ্যোগ নিচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়া গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাই করার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে, আর্থ সামাজিক অবস্থা, প্রযুক্তির অভাবের ফলে সেই দক্ষতা এখনও অনেকের মধ্যেই গড়ে ওঠেনি। ফলে, ভুয়ো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবু ভোটারদের এই সময়ে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সহজ টিপস: মেসেজ ফরওয়ার্ড করার আগে সোর্স চেক করুন, অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট দেখুন। (WhatsApp vote)

ডিজিটাল যুগের ভোটার হওয়ার চ্যালেঞ্জ

এই ঘটনা শুধু একটি নির্বাচনের নয়, গোটা গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ। যেখানে মেসেজ এক ক্লিকে হাজারো মনে পৌঁছে যায়, সেখানে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরাসরি প্রভাব নির্ণয় করা কঠিন হলেও, দীর্ঘমেয়াদে ভোটারদের মানসিকতা গঠনে এই বার্তাগুলির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তবে সচেতনতা বাড়লে এই প্রভাব কমানো সম্ভব। প্রথমবারের ভোটাররা যদি মেসেজকে শুধু তথ্য হিসেবে না দেখে, যাচাইকৃত খবর হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে হোয়াটসঅ্যাপ সত্যিই গণতন্ত্রের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন