Aaj India Desk, কলকাতা: বহু বছরের শিক্ষকতা, গবেষণা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবেই সাধারণত কলেজের প্রিন্সিপাল পদে উন্নীত হন কোনও অধ্যাপক। দায়িত্ব বাড়ে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নেতৃত্বও তাঁর হাতে আসে। স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হয়, পদোন্নতির সঙ্গে বাড়বে বেতন ও আর্থিক সুবিধাও। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বহু কলেজে ছবিটা ঠিক উল্টো।(principal salary)
২০২১, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে নিয়োগ পাওয়া বহু প্রিন্সিপাল জানিয়েছেন, সহযোগী অধ্যাপক থেকে প্রিন্সিপাল হলেও তাঁদের মাসিক বেতন ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অবসরের আগে নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) ও গ্র্যাচুইটির হিসাব মেলাতে ৪ থেকে ৭ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সরকারকে ফেরত দিতে হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যাই নয়, বরং রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।
সূত্রের দাবি, সমস্যার মূল কারণ ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সিএস ব্রাঞ্চের একটি বিজ্ঞপ্তি। ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, নতুন পদে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশোধিত বেতন কাঠামোয় বেসিক পে এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে তা আগের পদের বেসিক পের সমান হয়। পাশাপাশি এই নিয়ম ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর বলে ধরা হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পরে যাঁরা প্রিন্সিপাল হয়েছেন, তাঁদের বেতন নতুন করে নির্ধারণের সময় আগের চেয়ে কমে যাচ্ছে।
কলেজ মহলের অভিযোগ, সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ যে হিসাব চূড়ান্ত করে বিকাশ ভবনে পাঠায়, তা সাধারণত অনুমোদিত হয়। কিন্তু প্রিন্সিপালদের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া কার্যত উল্টো ফল দিচ্ছে। এর ফলে পদোন্নতি হলেও আর্থিক সুরক্ষা থাকছে না।(principal salary)
অল বেঙ্গলি প্রিন্সিপালস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক এবং আশুতোষ কলেজের প্রিন্সিপাল মানস কবি বলেন, “কলেজে শিক্ষক হিসেবে যে বেতন পেতাম, প্রিন্সিপাল হয়েও অনেক ক্ষেত্রে তার থেকে কম পাচ্ছি। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পরে প্রিন্সিপাল হওয়া অনেকেই মাসে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা কম পাচ্ছেন। প্রিন্সিপালদের ক্ষেত্রে কোনও পে প্রোটেকশন নেই, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলেজের প্রিন্সিপাল সমীরণ মণ্ডল জানান, “আমাদের কলেজের এক সহযোগী অধ্যাপকের বেসিক বেতন ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা। তিনি ২০২৫ সালে হাওড়ার একটি কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর বেসিক পে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা। ফলে প্রতি মাসেই তাঁকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
অন্যদিকে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প ও ভাতার পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। এই দুই বাস্তবতার ফারাক নিয়েই এখন শিক্ষামহলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, কোনও শিক্ষকের জন্য প্রিন্সিপাল পদে উন্নীত হওয়া স্বাভাবিকভাবে পেশাগত সাফল্যের একটি ধাপ হওয়া উচিত। কিন্তু যদি পদোন্নতির ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যোগ্য শিক্ষকরা এই পদ গ্রহণ করতে অনীহা দেখাতে পারেন। এর প্রভাব সরাসরি কলেজের প্রশাসন এবং শিক্ষার মানের উপর পড়তে পারে। এই সমস্যায় প্রভাবিত প্রিন্সিপালের সংখ্যা ২৫০-রও বেশি। তবে উচ্চশিক্ষা দফতরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে অর্থ দফতরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, “সমস্যাটি বিবেচনায় রয়েছে। সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।”তবে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এদিকে অবসরপ্রাপ্ত ও অবসরোন্মুখ প্রিন্সিপালদের প্রশ্ন, অবসরের আগে যে বিপুল অঙ্কের টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই অর্থ কীভাবে ফেরত পাওয়া যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।


