কলকাতা: দীর্ঘ ‘কালারফুল’ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার।বিতর্ক, দাপট, মন্ত্রিত্ব, ভোটের লড়াই, সব মিলিয়ে মদন মিত্র (Madan Mitra) মানেই বাংলার রাজনীতির এক চেনা নাম। আর সেই মদন মিত্রই এবার বলছেন, “রাজনীতির উপর আমার ঘৃণা ছাড়া আর কিছু বাড়ছে না!”
কিন্তু হঠাৎ কেন এই বিতৃষ্ণা?
একসময়ের দাপুটে তৃণমূল নেতা মদন মিত্রের মুখে এমন বিস্ফোরক মন্তব্য। শুধু রাজনীতির পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ নয়, এবার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মদনের কথায়, ব্যক্তিগতভাবে তিনি ভাবছেন, আস্তে আস্তে কতটা রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া যায়। কারণ যত দিন যাচ্ছে, রাজনীতির উপর তাঁর ‘ঘৃণা’ ছাড়া আর কিছু বাড়ছে না।
‘কালারফুল’ ক্যারিয়ার!
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মদন মিত্র (Madan Mitra) নিজেই ছিলেন বাংলার রাজনীতির অন্যতম ‘কালারফুল’ চরিত্র। মন্ত্রী হয়েছেন, বিধায়ক হয়েছেন, দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। পোশাক থেকে বাচনভঙ্গি, সবেতেই ছিল আলাদা ছাপ। বিতর্কও কম ছিল না।
সবচেয়ে বড় অধ্যায় সারদা-কাণ্ড। ২০১৪ সালে সারদা চিটফান্ড মামলায় CBI তাঁকে গ্রেফতার করে। তদন্তকারী সংস্থা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, অর্থের অপব্যবহার এবং বেআইনি আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। পরে আদালত তাঁকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠায়। মদন মিত্র অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
সেখানেই কি গল্প শেষ?
সূত্রের খবর, ট্যাক্সি ইউনিয়নের সদস্যদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা, ২৪ নম্বর জওহরলাল নেহরু রোডের অফিসের আশপাশে সন্ধ্যার পর দুষ্কৃতীদের আনাগোনা, কালারহাটি এলাকায় ফ্ল্যাট দখল, স্থানীয় ক্লাবকে ব্যক্তিগত প্রভাবের আওতায় রাখার মতো নানা অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি তাঁর রাজনৈতিক পরিসরে একাধিক বিতর্কিত ব্যক্তির ওঠাবসা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হরিদেবপুরের কুখ্যাত দুষ্কৃতী নান্টি ওরফে বাবলু ঘোষের সঙ্গে মদনের (Madan Mitra) ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে জেলে থাকা ভিকি ওরফে রাকেশ সাউয়ের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। কামারহাটির গুড্ডু রহমান আনসারিকে নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, ছাব্বিশের ভোটে কামারহাটির কুখ্যাত দুষ্কৃতী আনোয়ারের মদতেই জয়ী হয়েছেন মদন মিত্র! বর্তমানে নামে তার থেকেই খুনের হুমকি পেয়েছেন বলে সূত্রের দাবি! অভিযোগ, তাঁকে বলা হয়েছে কামারহাটিতে ঢুকলে আর বেরোতে দেওয়া হবে না। সেই কারণেই রাজনীতি থেকে সরে আসতে চাইছেন মদন মিত্র, বলে সূত্রের খবর।
একইভাবে অতীতে নিউ ব্যারাকপুরের কেদার বঙ্কিম নামে এক দুষ্কৃতীকে ভবানীপুরের দলীয় কার্যালয়ে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও তোলা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁর মৃত্যুর দাবিও রয়েছে।
শুধু দুষ্কৃতী-যোগ নয়। সারদা চিটফান্ডের সময় বিষ্ণুপুরে মদন মিত্রের ভূমিকা, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর ব্যক্তিগত সচিবকে সামনে রেখে আর্থিক লেনদেন, প্রাপ্তির দোকান থেকে পোশাক বা ফ্যান্সি মার্কেটের কোনও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চশমা বিনামূল্যে নেওয়ার মতো নানা অভিযোগও ঘুরছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মদন মিত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের একাধিক সাংগঠনিক পদ ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন। সেই সময় তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই সরব হন এবং দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ জানান।
অর্থাৎ, একদিকে পুরনো বিতর্কের ভার, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে বড় বদল। তার মধ্যেই মদন মিত্র (Madan Mitra) বলছেন, রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
তাহলে কি সত্যিই ‘সৌ চুহা খাকে বিল্লি চলি হজ কো’?
নাকি এত বছরের রাজনৈতিক জীবনের শেষে মদন মিত্র বুঝতে পারছেন, যে রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি এতদিন নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন, সেই মঞ্চটাই এখন তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে? রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা কি সত্যিই আসছে? নাকি এও মদন মিত্রের রাজনৈতিক জীবনের আরেক বিস্ফোরক বাঁক?


