Aaj India Desk,আরামবাগ: শহর থেকে মহাকাশ উন্নতির দৌড়ে ভারত। অথচ একই রাজ্যের একটি গ্রামে আজও অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা আর বর্ষার আতঙ্কে দিন কাটছে মানুষের। গোঘাটের নকুণ্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের দেওয়ানচক যেন উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ।
ঝাঁ চকচকে ভারতের পাশে অন্য এক ছবি
স্বাধীনতার পর ৭৯ বছরে দেশের পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। একদিকে আধুনিক শহর, বিমানবন্দর, মেট্রো, শিল্পাঞ্চল, মহাকাশ গবেষণা অন্যদিকে গোঘাটের দেওয়ানচকের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের লড়াই এখনও রাস্তা, পানীয় জল এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক সমস্যাকে ঘিরে।
বর্ষা এলেই জলবন্দি গ্রাম
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বর্ষা শুরু হলেই দীর্ঘ সময় জলমগ্ন হয়ে থাকে এলাকা। ঘরবাড়িতে জল ঢুকে পড়ে, ক্ষতি হয় চাষের ফসল। রাস্তার অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। পর্যাপ্ত পথবাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর বাড়ে সমস্যা। চারপাশে ঝোপঝাড় থাকায় বিষাক্ত সাপের আতঙ্কও নিত্যসঙ্গী। এই পরিস্থিতিতে স্কুলপড়ুয়াদের যাতায়াত নিয়েও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা থাকে।
পাকা বাড়ির আশ্বাস, বাস্তবে বঞ্চনার অভিযোগ
দেওয়ানচকের বহু পরিবার এখনও মাটির দেওয়াল ও ত্রিপলের ছাউনির ঘরে বসবাস করে। বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি আবাসন প্রকল্পে দরিদ্রদের পাকা বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা থাকলেও তাঁরা সেই সুবিধা পাননি। জলমগ্নতার কারণে এলাকায় নিয়মিত কৃষিকাজও সম্ভব হয় না। ফলে বহু মানুষ অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসার চালান। কাজের অভাব এবং ১০০ দিনের কাজ না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয়স্থল, আজও অবহেলিত
নির্জন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই এলাকায় পুলিশের চোখ এড়িয়ে আত্মগোপন করতেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। স্থানীয় বাসিন্দারাই তাঁদের আশ্রয় দিতেন বলে জানা যায়। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরও সেই গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
বাসিন্দাদের কথায় হতাশার ছবি
দেওয়ানচকের বাসিন্দা অসীমা পোদ্দার মিড-ডে মিল রান্নার কাজ করেন। তাঁর কথায়, গ্রামে বিষাক্ত সাপের উপদ্রব এতটাই বেশি যে নিজের পাশাপাশি সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও সবসময় উদ্বেগে থাকতে হয়। মনসা সর্দারের অভিযোগ, কৃষিকাজ ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। অনেকের দু’বেলা খাবার জোটানোও কঠিন। পরিস্থিতির চাপে সামর্থ্যবানদের কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
নতুন সরকারের কাছে উন্নয়নের দাবি
স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক স্বপন ঘোষালের আবেদন, নতুন সরকার যেন দেওয়ানচকের সমস্যাগুলির দিকে নজর দেয়। তাঁর বক্তব্য, দেশ স্বাধীন হলেও গ্রামের মানুষের জীবন এখনও নানা বাধায় আবদ্ধ।
রাজনৈতিক তরজার মাঝেও আশ্বাস
দেওয়ানচক থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গোঘাটের প্রাক্তন বিধায়ক বিশ্বনাথ কারকের বাড়ি। অতীতে তিনি একাধিকবার এই এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়েছেন। তবে অনুন্নয়নের অভিযোগের দায় তিনি নিতে চাননি। তাঁর দাবি, বিধায়ক থাকাকালীন উন্নয়নের চেষ্টা করলেও তৃণমূল তাঁকে কাজ করতে দেয়নি।
অন্যদিকে বর্তমান বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগার জানিয়েছেন, এলাকার পরিস্থিতি বদলাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাঁদের পাকা বাড়ি নেই, তাঁদের আবাসন প্রকল্পের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, এতদিন অন্ধকারে থাকা দেওয়ানচকেও এবার উন্নয়নের কাজ শুরু হবে।
প্রশ্ন একটাই স্বাধীনতার আট দশকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উন্নয়নের এই বৈষম্য কবে কাটবে? দেওয়ানচকের বাসিন্দারা এখন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।


