Aaj India desk, কলকাতা: দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরেছিলেন তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। বরাবরই মুক্ত চিন্তা এবং বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন তিনি। বাংলাদেশি ইসলাম মৌলবাদের কারণে মহিলাদের দুরবস্থা এবং সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন নিজের লেখায় তুলে ধরেছেন। ফলে মৌলবাদীদের কোপানলে পড়েছেন তিনি। তার জন্মভূমি বাংলাদেশ বাধ্য হয়েছে তাকে বার করে দিতে। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন কলকাতায়। তসলিমার কথায় “কলকাতায় থাকলে মনে হয় দেশেই রয়েছি। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারি।” কিন্তু এই কলকাতা থেকেও বিতাড়িত হতে হল তাকে। ২০০৭ এ তৎকালীন বাম সরকার তাকে কলকাতা থেকে বার করে দেয়। প্রশ্ন হলো সব কি এমন হয়েছিল?
ঘটনার সূত্রপাত কোথায় ?
ঘটনা সূত্রপাত হয় তসলিমা নাসরিনের(Taslima Nasrin) লেখা আত্মজীবনী দ্বিখন্ডিত থেকে। বইটিতে ডাক্তার হিসেবে তসলিমার অভিজ্ঞতা লেখা ছিল। তৎকালীন সময়ে নিরিখে অত্যন্ত সাহসী ছিল এই বইটি। নারীর কামনা বাসনা এবং তাদের উপরে ধর্মের নিপীড়ন উঠে এসেছিল এই বইতে। বইতে তাসলিমা ইসলাম প্রতিষ্ঠাতা নবী সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেন যা ক্ষেপিয়ে দেয় দুই দেশের মুসলিমদের। স্বাভাবিকভাবেই মৌলবাদীরা আরো বেশি করে তাকে আক্রমণ করার সুযোগ পায়। বইটিকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গেও বলা হয় এই বই দাঙ্গা তৈরি করতে পারে। সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন দ্বিখন্ডিত কোন সাহিত্য নয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু ঘটনা এখানে শেষ হয় না বরং শুরু হয়।
হায়দ্রাবাদ , আগষ্ট ২০০৭:
২০০৭ এর আগস্ট মাসে তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin) হায়দ্রাবাদ প্রেস ক্লাবে যান নিজের বই শোধনের তেলেগু অনুবাদ প্রকাশ করতে। ততদিনে ইসলাম বিদ্বেষী বলে তসলিমা পরিচিত হয়ে গেছেন। শোধন বইটিও এই একই দোষে দোষিত ছিল। হায়দ্রাবাদের অনুষ্ঠানে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’ (MIM) নামে এক পার্টির ৩ জন স্থানীয় বিধায়ক (MLA)—আফসার খান, আহমেদ পাশা কাদরি এবং মোয়াজ্জেম খান হাজির হন। দলবল নিয়ে তারা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। তাসলিমাকে লক্ষ্য করে ফুলদানিও ছুড়ে মারা হয়। এমন কিছু অর্থাৎ খেতে হয় তাকে। তাসলিমা বলেছিলেন, “মৃত্যুভয় কাকে বলে বুঝলাম।” হায়দ্রাবাদের কংগ্রেস সরকারের পুলিশ অবশ্য তসলিমাকেই দাঙ্গা ছড়ানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে।
কলকাতা , নভেম্বর ২০০৭ :
অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরামের সভাপতি ইদ্রিস আলী তসলিমার(Taslima Nasrin) কলকাতায় থাকার ব্যাপারে তীব্র বিরোধিতা করেন।তাঁদের মূল দাবি ছিল তসলিমা নাসরিনের ভিসা বাতিল করে তাঁকে ভারত থেকে তাড়ানো। কারন সেই একই ইসলাম ভাবাবেগে নাকি তিনি আঘাত দিয়েছেন। ২১ নভেম্বর কলকাতার পার্ক সার্কাস, মল্লিকবাজার এবং রিপন স্ট্রিট এলাকায় সকাল পৌনে ১০টা নাগাদ পথ অবরোধ শুরু হয়। সেখান থেকে পরিস্থিতি ক্রমশ দাঙ্গার দিকে চলে যায়। ফলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর এই প্রথম কলকাতার রাস্তায় সেনাকে নামাতে হয়। তৎকালীন মনমোহন সিংয়ের কেন্দ্রীয় সরকার আর তসলিমাকে কলকাতায় রাখতে সাহস পায়নি। রাজ্য সরকারকে বারবার তারা বলে তসলিমাকে সরিয়ে দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নির্দেশ দেন তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে হবে।
দেশত্যাগ কীভাবে হলো ?
কেন্দ্রীয় সরকার তসলিমার (Taslima Nasrin)নিরাপত্তার জন্য তাকে এক প্রকার গৃহবন্দী করে। এই বন্দিত্ব তসলিমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত সুইডেন সরকার তাকে আশ্রয় দেয়। ভারত ছেড়ে সেখানেই চলে যান তসলিমা। এরপর রাজ্যে পালাবদল হলো। বাম সরকার বদলে গিয়ে এলো তৃণমূল সরকার। পরবর্তীকালে ইদ্রিস আলী তৃণমূলে যোগ দেন। সাংসদ বিধায়ক হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা যান ২০২৪ সালে। তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের জমানায় তসলিমা ভারতে ফিরতে পারেননি। কিন্তু প্রশ্ন হল ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকারে রয়েছে বিজেপি। তারপরেও কিন্তু ভারতে তসলিমা ফিরতে পারেননি। তারপর ইদ্রিস মারা গেলেন , বাংলাদেশে সরকার বদলে গেল এবং রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার এলো। তসলিমা শেষ পর্যন্ত কলকাতা ফিরলেন।


