Aaj India Desk, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের বাজেট আলোচনা (Budget Session) চলাকালীন একেবারেই অন্য মেজাজে দেখা গেল তৃণমূল নেতা (TMC Leader) ও রাজ্যের প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে (Firhad Hakim)। গোটা বক্তব্য জুড়েই তিনি ছিলেন বেশ খোশমেজাজে। কখনও রসিকতা, কখনও আত্মসমালোচনা, আবার কখনও রাজনৈতিক সৌজন্যের নজির—সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্যে বারবার হাসির রোল ওঠে বিধানসভায়। আর সেই খোশমেজাজেই বিজেপির নবনিযুক্ত পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের (Agnimitra Paul) কাজের প্রকাশ্য প্রশংসা করে সকলকে চমকে দেন তিনি।
বাজেট আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফিরহাদ হাকিম বলেন, “মাত্র আড়াই মাস আপনি সময় পেয়েছেন। এর মধ্যে আপনি যেভাবে চারিদিকে দৌড়াচ্ছেন, আমি হয়তো তা পারিনি। যেভাবে সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছেন, আমি হয়তো সেটা করতে পারিনি। এটা আমি স্বীকার করছি।” তাঁর এই মন্তব্যে বিধানসভায় উপস্থিত অনেকেই অবাক হন। ঠিক সেই সময় তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী হালকা টিপ্পনি কাটলে, ফিরহাদও রসিকতার সুরে জবাব দেন। তিনি বলেন, “আমি আপনাদের সমর্থন করে বলবার চেষ্টা করছি, আর আপনি আমাকে জোর করে বিরোধী বানাবার চেষ্টা করছেন!” তাঁর এই মন্তব্যে হাসির রোল পড়ে কক্ষে।
এরপর রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রসঙ্গ টেনে ফিরহাদ বলেন, “বামেরা যখন ৭৭ সালে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন তারা ৭৫ থেকে ৭৭ সালের কংগ্রেস শাসন নিয়ে সমালোচনা করেছিল। আমরা যখন ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসি, তখন বামেদের ৩৪ বছরকে আক্রমণ করেছি। আপনারাও যেদিন চলে যাবেন…” ঠিক তখনই শাসকদলীয় বেঞ্চ থেকে আওয়াজ ওঠে, “আমরা ৫০ বছর থাকব!”
সেই মন্তব্যের জবাবে হেসে ফিরহাদ বলেন, “৫০ বছর কেন, আপনারা একশো, দু’শো বা পাঁচশো বছরও থাকতে পারেন। কিন্তু কালের নিয়মে একদিন তো সরতেই হবে। তখন আপনাদের কাজ নিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম সমালোচনা করবে। শুভেন্দু অধিকারী বা অগ্নিমিত্রা পালের নেতৃত্বে আমার শহর যদি ভাল হয়, তবে তো আমি গর্বিতই হব।”
শুধু প্রশংসাতেই থেমে থাকেননি প্রাক্তন পুরমন্ত্রী। শহরের অন্যতম বড় সমস্যা জলাভূমি ভরাটের বিষয়েও বর্তমান মন্ত্রীকে সতর্ক করে দেন তিনি। ফিরহাদ বলেন, “পুরনো ইমারতের ভাঙা অংশ ফেলে বেআইনিভাবে জলাভূমি বোজানো হচ্ছে। এটা পুলিশের সাহায্য নিয়ে শক্ত হাতে বন্ধ করা উচিত। আমিও আমার সময়ে অনেক চেষ্টা করেছি। আপনি যেভাবে ছুটছেন, আপনিই পারবেন এটা বন্ধ করতে।”
ফিরহাদের প্রশংসার জবাব দিতে গিয়ে অগ্নিমিত্রা পালও নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, “প্রাক্তন মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে আমি সারাদিন ধরে শহরের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।” তবে প্রশংসার পাশাপাশি তিনি আগের সরকারের কাজ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। অগ্নিমিত্রার কথায়, “১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও কেন আপনারা এই সমস্যাগুলোর সুনির্দিষ্ট সমাধান করতে পারলেন না? জমা জল আর নিকাশি ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ সব টাকা গেল কোথায়? কেন শুধু প্রভাবশালী মন্ত্রী-নেতাদের পুরসভার জন্যই বাজেট বরাদ্দ হত? বিজেপির রাজত্বে এই পক্ষপাতিত্ব আর চলবে না।”
এদিন বাজেট আলোচনায় শহরকে আরও পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব করে তোলার জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করা হয়। সরকারের লক্ষ্য, রাজ্যের প্রতিটি বাড়ি থেকে নিয়মিত আবর্জনা সংগ্রহ করা এবং রাস্তায় ময়লা ফেলার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা। সেই উদ্দেশ্যে সব ময়লার গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে গোটা রাজ্যে চালু হবে ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’, যার মাধ্যমে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ওপর আরও নজরদারি করা সম্ভব হবে।
পরিবেশ রক্ষার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবর্জনা থেকে আবীর তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন পুকুরের প্রায় ৫০ শতাংশ কচুরিপানা ব্যবহার করে হস্তশিল্প তৈরি করা হবে, যাতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর লক্ষ্যে শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হবে ‘বটল ক্রাশার’। সেখানে প্লাস্টিকের বোতল ফেললে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে কাপড়ের থলে পাবেন। সংগৃহীত প্লাস্টিক পরবর্তীতে রাস্তা নির্মাণ এবং পোশাক তৈরির কাজে ব্যবহার করা হবে।
এছাড়া আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রকাশ্যে থুতু ফেলা বা প্রস্রাব করার মতো কাজের বিরুদ্ধে কড়া জরিমানার ব্যবস্থা চালু করা হবে। নতুন আবাসন এবং বাড়িগুলিতে বাধ্যতামূলকভাবে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে সেই জল বাথরুম ও কাপড় কাচার মতো দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা যায়।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। ইউআইডিএফ (UIDF) তহবিলের অর্থে কলকাতায় নতুন রিং রোড তৈরি হবে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিটকে লন্ডনের বিখ্যাত অক্সফোর্ড স্ট্রিট-এর আদলে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য ‘মা আহার’ প্রকল্পেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এবার থেকে সেখানে ডিম, মাছ এবং নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে। পাশাপাশি বসে খাওয়ার সুবিধাও চালু করা হবে।
অন্যদিকে, পুর প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনতে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। পার্কিংয়ে তোলাবাজি বন্ধ করতে নগদ টাকা নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। এবার থেকে পার্কিং ফি শুধুমাত্র অনলাইনেই জমা দেওয়া যাবে।
একই সঙ্গে টাকা নিয়ে বেআইনিভাবে হকার বসানোর অভিযোগের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সরকারের স্পষ্ট বার্তা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। ইতিমধ্যেই একাধিক ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। বাকি ক্ষেত্রেও দ্রুত তদন্ত শুরু হবে, যাতে ভবিষ্যতে গার্ডেনরিচ বা তারাতলার মতো বেআইনি নির্মাণ বা দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।


