SPECIAL FEATURE
মুর্শিদাবাদের গণেশপুরের একপ্রান্তে, ছোঁয়াচে স্মৃতির ধুলো জমেছে জীর্ণ বাড়ির দেওয়ালে। সেখানে বসে আছেন ষাটোর্ধ গোপালকৃষ্ণ সাহা, যিনি ছাত্রজীবন থেকে বামপন্থী (Left Front) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। একসময় মাঠে ঘাটে ঘুরে গা ঢাকা দিয়ে লাল পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি, হাতে কাস্তে-হাতুড়ি চিহ্নের সঙ্গে আত্মার এক অদৃশ্য সম্পর্ক নিয়ে। আজ সেই সময়ের আবহ না থাকলেও, গোপালকৃষ্ণের চোখে লাল সেলামের দীপ্তি এখনও অম্লান।
একসময় ভোটের আগে এলাকা যেখানে লাল-পতাকায় রাঙা হয়ে থাকত এখন সেখানে রাস্তার দু-পাশে দু-রকম ফুলের বাহার। নিজের ভগ্নপ্রায় হার জিরজিরে বাড়িটার দালানে বসে অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোপালকৃষ্ণ অম্লান বদনে চেয়ে দেখেন ‘ওদের দাপট’। মুখে বিড়বিড় করে বলেন, “ওদের কাছে টাকা আছে। ষড়যন্ত্রের মানসিকতা আছে। কিন্তু আমাদের আদর্শ আছে। তাই তো…”।
আর কথা বলেন না গোপালকৃষ্ণ। ধীর পায়ে উঠে গিয়ে ঘর থেকে একটা মলিন হয়ে যাওয়া লাল পতাকা এনে নিজের জীর্ণ বাড়িটার বাইরের দেওয়ালে লাগান। তারপর এগিয়ে যাওয়া মিছিলটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখেন। ঘোলাটে চোখে স্বপ্ন আঁকেন লাল আলোয় জ্বলজ্বল করছে মহাকরণ, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
গোপালকৃষ্ণ একা নন, বাসে, ট্রামে, লোকাল ট্রেনে কিংবা রিকশায়, শহর থেকে মফস্বল, চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “CPM কিন্তু খারাপ ছিল না…”! বিশ্লেষকরা বলেন, এই কথাটা সম্পূর্ণ সমর্থনযোগ্য নয়, আবার পুরোপুরি অস্বীকারও করা যায় না। এটা এক ধরনের সময়ের তুলনা, হতাশার প্রকাশ, আর কিছুটা স্মৃতির নরম আলো। বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, একসময় পশ্চিমবঙ্গ মানেই ছিল বাম রাজনীতি। দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসন শুধু একটা সরকার নয়, একটা সংস্কৃতি তৈরি করেছিল। সংগঠন, ক্যাডার, ইউনিয়ন, এবং এক ধরনের রাজনৈতিক শৃঙ্খলা। কিন্তু সেই শক্তি আজ কোথায়?
বামফ্রন্টের (Left Front) পতন হঠাৎ করে হয়নি। তার ভিত নড়ে গিয়েছিল ধীরে ধীরে।
জমি আন্দোলন, বিশেষ করে নন্দিগ্রাম এবং সিঙ্গুর, সরকার ও মানুষের মধ্যে বিশ্বাসে বড় ফাটল ধরায়।
শিল্পায়নের প্রচেষ্টা, যা ভবিষ্যতের পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, সেটাই রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হয়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি। মানুষ পরিবর্তন চায়। এটা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম।
নতুন সময়, নতুন মেরুকরণ
আজকের বাংলার রাজনীতি মূলত দুই শক্তির লড়াই। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল,
অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি। এই দুই মেরুর মধ্যে বামপন্থীরা (Left Front) যেন মাঝপথে আটকে পড়েছে। না পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক, না পুরোপুরি অদৃশ্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে দুর্নীতি, তোষণের রাজনীতি যে মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছে, তা শুধু বুদ্ধিজীবী নয়, মেনে নিচ্ছেন সাধারণ মানুষের একাংশও। অন্যদিকে, বিজেপির বিভাজনের রাজনীতিও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না বঙ্গবাসীর। কিন্তু প্রশ্ন একটাই? বিকল্প কে?
সবচেয়ে বড় সংকট: মুখের অভাব
আজকের বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা আদর্শ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নয় বরং নেতৃত্ব।
নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী, স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে, বামফ্রন্টে (Left Front) এমন “মুখ” নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজনীতিতে শুধু সঠিক কথা বললেই হয় না, সেটা কারা বলছে তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কাস্তে হাতুড়ির ফেরার পথ কি আছে?
- নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা
- গ্রাম থেকে শহর, সংগঠন পুনর্গঠন
- শুধু বিরোধিতা নয়, বিকল্প ভিশন দেখানো
- শরীক দলগুলোকে এক জায়গায় এনে শক্তিশালী, কৌশলগত জোট
এই সব মিলিয়ে তবেই একটা বাস্তবসম্মত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।


