29 C
Kolkata
Tuesday, March 24, 2026
spot_img

আলো নয়, অন্ধকারেই জ্বলছে আসল আগুন তারকেশ্বরের বুল্টির গল্প

Aaj lndia Desk, হুগলি: অগ্নিকন্যা, ভূমিকন্যা এই শব্দগুলো একসময় ছিল সংগ্রাম, শক্তি আর প্রতিরোধের প্রতীক। আজ সেগুলো যেন রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং-এর স্লোগান হয়ে গেছে। যাকে খুশি, যখন খুশি, সেই তকমা পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো এগুলো কি সত্যিই প্রাপ্যদের হাতে যাচ্ছে, নাকি শুধু ভোটের বাজারে বিকোচ্ছে?

যে মেয়েটা প্রতিদিন লড়ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, সমাজের চোখরাঙানির বিরুদ্ধে তার নামের আগে “অগ্নিকন্যা” বসে না। কারণ সে ক্যামেরার সামনে নেই, তার পেছনে কোনও দল নেই, কোনও মাইক নেই। সে অন্ধকারেই হারিয়ে যাচ্ছে। তার লড়াই খবর হয় না, তার চোখের আগুন ট্রেন্ডিং হয় না। এই অন্ধকারে এক লুকিয়ে থাকা “অগ্নিকন্যার” গল্পই তোলে ধরবো আজ ।

তারকেশ্বর (Tarkeshwar) এর আসল “অগ্নিকন্যা”কে কেউ দেখেছেন? মঞ্চে নয়, মাইকে নয় একটা ঝুপড়ির ভেতরে বসে আছে সে। নাম তার বুল্টি রায়। আলো ঝলমলে স্টেডিয়ামে নয়, জীবনের কঠিন ট্র্যাকে দৌড়ে সে জিতেছে। World Masters Games 2026-এ জোড়া স্বর্ণপদক শুনতে যতটা গর্বের, তার পেছনের গল্পটা তার থেকেও ভারী। কারণ এই সোনার রং চকচকে নয়, এতে মিশে আছে ঘাম, অভাব আর অবহেলার ধুলো। তারকেশ্বর(Tarkeshwar) – এর এক ঝুপড়িতে থাকে বুল্টি (Bulti)। সংসারে দুই সন্তান, স্বামী আর প্রতিদিনের লড়াই। ট্রেনে হকারি করে দিন চলে। সকালে রুটি জোগাড়, বিকেলে দৌড়ের অনুশীলন এই তার রুটিন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার? কোনও অভিযোগ নেই। নেই “আমাকে কেন কেউ দেখছে না” এই আক্ষেপটুকুও।এটাই কি আসল আগুন নয়?যেখানে রাজনীতির মঞ্চে “অগ্নিকন্যা” তকমা বিলি হয় হাততালির মাপে, সেখানে বুল্টি রায়ের মতো মানুষরা কোনও তকমা ছাড়াই আগুন হয়ে বেঁচে থাকে। ওর লড়াইয়ের পাশে কোনও ব্যানার নেই, কিন্তু আছে এক অদম্য জেদ যেটা হয়তো অনেক ‘বড় বড়’ নামের থেকেও বেশি উজ্জ্বল। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায় আমরা কাকে “অগ্নিকন্যা” বলছি? যে আলোয় দাঁড়িয়ে আছে, নাকি যে অন্ধকার কেটে আলো তৈরি করছে? হয়তো সময় এসেছে মঞ্চের আলো থেকে চোখ সরিয়ে, একটু ঝুপড়ির দিকেও তাকানোর। কারণ আসল আগুনটা সেখানেই জ্বলছে নিঃশব্দে, কিন্তু অবিরাম।

ঘরের প্রতিটা কোণে হাত দিলেই ধুলো ঝরে পড়ার কথা কিন্তু এখানে ঝরে পড়ে ইতিহাস। পুরনো মেডেল, ফিকে হয়ে যাওয়া সার্টিফিকেট, কোথাও একটা ভাঙা ট্রফি যেন এই কুঁড়েঘরের দেওয়ালগুলোই সাক্ষী, কতবার নিজের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন বুল্টি রায়।এইটুকু জায়গা যেখানে চারজন মানুষ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে, রান্নার ধোঁয়া আর স্বপ্ন একসাথে মিশে যায় সেখান থেকেই উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চের সোনা। World Masters Games 2026-এ জোড়া স্বর্ণপদক জেতা শুধু সাফল্য নয়, এটা একধরনের প্রতিবাদ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, অবহেলার বিরুদ্ধে। ভাবতে অবাক লাগে, যে ঘরে ঠিকমতো জায়গা নেই হাঁটার, সেই ঘরই বানিয়ে ফেলেছে দৌড়ানোর সাহস। যে জীবনে প্রতিদিনের লড়াই চালাতে ট্রেনে হকারি করতে হয়, সেই জীবনই আবার বিশ্বমঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করে। তবু কোথাও একটা খচখচানি থেকেই যায়। এই গল্পটা কি শুধু অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে, নাকি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলবে?

কারণ, হাততালি দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু সেই হাতটাই যদি একটু এগিয়ে আসত একটু সহায়তা, একটু স্বীকৃতি তাহলে হয়তো এই আগুনটা আরও বড় আলো হয়ে জ্বলতে পারত।

বুল্টি রায়ের গল্প তাই শুধু জয়ের গল্প নয়, এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রতিভা কখনও অভাবের কাছে হার মানে না,কিন্তু অবহেলা তাকে অনেক দূর এগোতে দেয় না।

তারকেশ্বরের জয়কৃষ্ণ বাজারের বটতলার সেই ভাড়া বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ, ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এটা আসলে একটা সংগ্রহশালা। শুধু পার্থক্য একটাই এখানে জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখার মতো জায়গা নেই। তাই ঘরের কোণ, বিছানার তলা যেখানেই হাত পড়ে, সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে মেডেল, স্মারক, সনদ , যেন লড়াইগুলো চুপচাপ জমা হয়ে আছে। World Masters Games 2026 সেখান থেকে দুটো সোনা, একটা রুপো নিয়ে ফেরা মানুষটা আজও প্রতিদিন লড়ছেন। সংসারে লড়াই, প্র্যাকটিসে লড়াই, আর জীবনের সঙ্গে একটানা টানাপোড়েন। কন্ট্রাকচুয়াল কাজ সেখানেও অনিশ্চয়তা। তবু থামেননি। কারণ সামনে এখনও “ছ-সাতটা ধাপ” বাকি। আর সেই ধাপ পেরোতে হলে দিনে ছয় ঘণ্টা প্র্যাকটিস শরীরের সঙ্গে যেমন লড়াই, তেমনই সময়ের সঙ্গেও। এই ঘরে একটা ছোট্ট ডাইনিং টেবিল আছে কিন্তু চারজন একসাথে বসে খাওয়ার জায়গা নেই। ছেলে-মেয়ে টেবিলে বসে, আর তিনি ও তাঁর স্বামী মাটিতে। মেডেল রাখার জায়গা নেই কিছু মরচে পড়ে যাচ্ছে, কিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কণ্ঠে চাপা কষ্ট “এত মেডেল রাখার মতো জায়গা নেই আসল সম্মানটা বোধহয় আমি ওদের দিতে পারছি না।” এটা কি শুধুই এক ব্যক্তির হাহাকার? নাকি আমাদের গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি? ১৪ বছরে বহুবার মিডিয়া এসেছে, গল্প শুনেছে, দেখেছে কিন্তু গল্পের শেষে কিছুই বদলায়নি। আলো এসেছে, কিন্তু উষ্ণতা আসেনি।তবু সবশেষে দাঁড়িয়ে থাকে একটা দৃশ্য কোনও মঞ্চ নয়, কোনও ক্যামেরা নয় একজন মানুষ, আর তাঁর পাশে আরেকজন। “আমার স্বামী পাশে না থাকলে কিছুই হতো না।” হয়তো এটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় সত্যি সব লড়াই একা লড়া যায় না। কেউ একজন পাশে থাকে বলেই, ঝুপড়ির ভেতর থেকেও বিশ্বজয় সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন