SPECIAL FEATURE
নির্বাচনের ঘণ্টা (West Bengal Assembly Election 2026) বাজতেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত দ্বৈত নাটক! একদিকে প্রার্থীদের “মাটির মানুষ” হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ভয় আর আশঙ্কার তীব্র রাজনৈতিক প্রচার। জনসভা, মিছিল তো আছেই। আরও এক ধাপ এগিয়ে টিকট পাওয়া প্রার্থীরা একেবারে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ মত আমজনতার বাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে পড়ছেন।
কারও দাঁড়ি কামিয়ে দেওয়া, সাবান মাখিয়ে দেওয়া এমনকি ‘আপনজন’ হয়ে ওঠার চেষ্টায় গৃহিণীর হেঁশেলেও ঢুকে পড়েছেন প্রার্থীরা। রুটি বেলা, মশলা বাটার মত কাজ করে দিয়ে মা-বোনদের মন জয়ের এক দুরন্ত চেষ্টা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসির খোরাক হয়েছেন জনপ্রতিনিধি হওয়ার লক্ষ্যে ভোটের ময়দানে নামা প্রার্থীরা। অন্যদিকে, সমানতালে ছড়িয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কের বার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অদ্ভুত এক ভয় আর আবেগের সুচারু মঞ্চায়ন শুরু করেছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপি (BJP)।
‘ওরা এলে সব বন্ধ করবে…’
তৃতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের রাশ নিজের হাতে রাখতে একুশের ভোটের আগে থেকেই ‘ভয় মনস্তত্ত্ব’ প্রয়োগ করে আসছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সংখ্যালঘু প্রায় ২৭.১ শতাংশ। যদিও ২০২৬-এর মধ্যে এই সংখ্যা অনেকাটাই বেড়ে গিয়েছে বলে দাবী বিজেপির। হিন্দুরা ৭০.৫৪%, খ্রিস্টান ০.৭২%, বৌদ্ধ ০.৩১%, শিখ ০.০৭%, জৈন ০.০৭%, অন্যান্য ১.০৩%।
এদিকে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার বহু পরিচিত সামাজিক রীতি ও স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, এমনকি তথাকথিত ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই ‘ভয় মনস্তত্ত্বে’ ফলাফলও পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাতা রাজনীতির পাশাপাশি এটিও তাঁর অন্যতম নির্বাচনী (West Bengal Assembly Election 2026) মহাস্ত্র।
‘বাংলা বদলে যাচ্ছে’
অন্যদিকে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের বাংলার মানুষের নিদানের পর কিছু স্ট্র্যাটেজিক পরিবর্তন এনেছে বিজেপি (BJP)। গো-বলয়ের রাজনীতি যে এখানে খাটবে না, তা গত নির্বাচনে ৭৭ আসন পেয়েই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বিজেপি। তাই ছাব্বিশের ভোটে (West Bengal Assembly Election 2026) মমতার পাশাপাশি ‘বাঙালি অস্মিতার’ পালে হাওয়া দিচ্ছে তাঁরাও। দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ তকমা’, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকারি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রগান বাধ্যতামূলক করা, বাংলার মনিষীদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ইত্যাদি করেছে বিজেপি।
তবে সেইসঙ্গে তাঁদের ‘ভয় দেখানোর’ রাজনীতির অঙ্গ হিসেবে বারবার শোনা গিয়েছে ‘অনুপ্রবেশ’ এবং ‘জনবিন্যাস পরিবর্তনের’ বুলি। এইভাবে যে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কেই ইঙ্গিত করছে বিজেপি, তা বলাই বাহুল্য। “বাংলা বাংলাদেশ হয়ে যাচ্ছে”-এর মতো বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকেত, যা নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্নকে সামনে আনে। পাশাপাশি, রাজ্যে তুষ্টিকরণ, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়া এবং জনসংখ্যাগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলা নিজের স্বাতন্ত্র্য হারাতে বসেছে, তো আছেই (West Bengal Assembly Election 2026)।
ভয় বনাম তথ্য
এই দুই বয়ানের মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট! দুটিই ভয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ভাষ্য ক্রমশ এমন জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হল, এই ভয় কতটা বাস্তব, আর কতটা কৌশলগত?
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ভয় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি দ্রুত মানুষের মনোযোগ কাড়ে, সহজে মনে থাকে, এবং ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। কিন্তু এর একটি বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। এটি সমাজকে মেরুকৃত করে, যুক্তিকে দুর্বল করে, এবং গণতান্ত্রিক আলোচনাকে সংকীর্ণ করে।
ভোট (West Bengal Assembly Election 2026) গণতন্ত্রের উৎসব। কিন্তু সেই উৎসব যদি আতঙ্কের আবহে ঢেকে যায়, তাহলে তা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য শুভ নয়। ভোটারদের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ! ভয় নয়, তথ্যকে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র টিকে থাকে আতঙ্কে নয়, সচেতনতায়।


