Aaj India Desk: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি নাম বারবার ফিরে আসে—মুকুল রায় (Mukul Roy)। ‘দল বদল’ শব্দবন্ধটি রাজ্য রাজনীতিতে যতবার আলোচনায় এসেছে, প্রায় প্রতিবারই তার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নেপথ্যে থেকে কৌশল সাজানোর জন্যই তাঁকে বলা হত ‘বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য’। তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের কাহিনি নয়; বরং গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলার ক্ষমতার রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মুকুল রায়ের (Mukul Roy) রাজনৈতিক যাত্রা শুরু কংগ্রেসের হাত ধরে ছাত্র রাজনীতিতে। তবে তাঁর প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৯৯৮ সালে, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। সেই সময় থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা দলের অন্যতম প্রধান সংগঠক। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মমতার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং সংগঠনের ভিত শক্ত করার দায়িত্ব কার্যত তাঁর হাতেই ন্যস্ত হয়।
দল গঠনের প্রথম দিকের কঠিন সময়ে বুথস্তর থেকে জেলা সংগঠন তৈরি, কর্মী সংগ্রহ, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মহলে তাঁকে ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ বলা হত শুধু পদমর্যাদার জন্য নয়, বাস্তবিক সংগঠন পরিচালনার ক্ষমতার কারণেও।
মুকুল রায় (Mukul Roy) শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে দিল্লির রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। কেন্দ্রীয় সরকারের রেল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ছাপ রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও দরকষাকষির ক্ষমতা তৃণমূলকে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে সাহায্য করেছিল।
১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি সংগঠন বিস্তারের দায়িত্ব সামলান। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা ছাড়িয়ে ত্রিপুরা, অসম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংগঠন গড়ার চেষ্টা শুরু হয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তৃণমূলের দ্রুত উত্থানের পিছনে অন্যতম কৌশলবিদ ছিলেন মুকুল রায়।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঠিকানা তৃণমূল ছেড়ে ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল তখনই। বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী করতে তাঁর অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা নেয় বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
বিশেষ করে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বাংলায় বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তারে তাঁর কৌশলগত ভূমিকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। বহু পুরনো রাজনৈতিক কর্মী ও স্থানীয় নেতৃত্বকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলেই মত পর্যবেক্ষকদের।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মুকুল রায়। কিন্তু নির্বাচনের ফল ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আবার তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসেন। এই ‘ঘর ওয়াপসি’ রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দলত্যাগ বিরোধী আইন, বিধায়ক পদ বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়।
তাঁর প্রত্যাবর্তন শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না—বরং তা বাংলার রাজনীতিতে ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণ কত দ্রুত বদলায়, তারও একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।
শেষ জীবনে অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যান মুকুল রায়। জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি কমে আসে। তবে রাজনৈতিক আলোচনা থেকে কখনও হারিয়ে যাননি তিনি। দলবদল, কৌশলগত রাজনীতি এবং সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়েছে।
মুকুল রায়ের রাজনৈতিক যাত্রাপথ দেখিয়েছে—রাজনীতিতে শুধু জনসমর্থন নয়, সংগঠন পরিচালনা ও কৌশল নির্ধারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি সামনের সারির বক্তা না হয়েও পর্দার আড়াল থেকে রাজনীতির গতিপথ প্রভাবিত করতে পারতেন।
তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে শুধু দলবদলের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং তা বাংলার রাজনৈতিক বিবর্তনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি—যেখানে আদর্শ, কৌশল, ক্ষমতা ও পরিস্থিতি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক জটিল কিন্তু প্রভাবশালী রাজনৈতিক অধ্যায়।


