32 C
Kolkata
Sunday, March 29, 2026
spot_img

তারুণ্যের দামে মাসিক ভাতা: স্বামীজি–সুভাষের বাংলায় নতুন বাস্তবতা

Opinion Piece

জল্পনা ছিলই। অবশেষে ৫ ফেব্রুয়ারি বিধানসভার অন্তর্বর্তী বাজেটে তাতে সিলমোহর পড়ল। স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের বাংলার যুবসমাজ লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম পূরণ করে মাস গেলে ‘বেকার ভাতা’ (Yuva Saathi Prakalpa) নেবে! লক্ষ্মীর ভান্ডারের পর আরও এক ‘সমাজকল্যাণ মূলক’ প্রকল্প মুখ্যমন্ত্রীর ভোটের ভান্ডার হয়ত পূরণ করবে। ভোটমুখী বাংলায় এটি নিঃসন্দেহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এই স্ট্রোক আদপে কাদের উপকারে, আর কাদের ভবিষ্যৎকে পঙ্গু করার মোক্ষম বাণ?

বিধানসভার অন্তর্বর্তী বাজেটে বাংলার যুবসমাজকে নির্ভরশীল করে তোলার পথে আরও এক ধাপ এগোল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২১ থেকে ৪১ বছর বয়সী বেকার যুবক–যুবতীদের জন্য মাসে ১৫০০ টাকার ভাতা—গালভরা নাম ‘যুব সাথী প্রকল্প’ (Yuva Saathi Prakalpa)। স্বামী বিবেকানন্দের বাংলায় যুবসমাজকে শেখান হয়েছিল আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা আর সংগ্রামের কথা। সুভাষচন্দ্র বসু দেখিয়েছিলেন বিদ্রোহী তারুণ্যের দিশা। সেই বাংলাতেই আজ যুবসমাজকে বলা হচ্ছে—লাইনে দাঁড়াও, ফর্ম পূরণ করো, মাস গেলে ভাতা নাও। স্বপ্ন দেখো ছোট করে, দাবি করো কম।

বলা বাহুল্য, অনেক পরিবারের কাছে ১৫০০ টাকা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ এনে দেয়। সৎভাবে কিছু গড়ার মানসিকতা নিয়ে ৫ বছর এই টাকা জমিয়ে যুবক-যুবতীরা চাইলে কোনও প্রশিক্ষণ অথবা ছোট করে কোনও ব্যবসা শুরুও হয়ত করতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ভাতা দেওয়ার বিষয়ে সরকারি যুক্তি স্পষ্ট—বেকার যুবকদের সাময়িক আর্থিক সহায়তা (Yuva Saathi Prakalpa)। প্রশ্নটা এখানেই—সাময়িক সহায়তা আর স্থায়ী সমাধানের ফারাকটা কোথায়?

যে রাজ্যে শিল্প নেই, নতুন কোনও বিনিয়োগ নেই, সরকারই চাকরির পরীক্ষা অনিয়মে জর্জরিত, সেখানে ভাতা কি আদৌ সমাধানের পথ? নাকি এটি এক ধরনের নীরব সামাজিক চুক্তি—চাকরি দিতে পারব না, তার বদলে তোমাকে ভাতা দেব, আর তুমি প্রশ্ন কম করবে? ভাতার রাজনীতির অভিঃসন্ধি আসলে খুব স্পষ্ট। সরকারের থেকে হাতে নগদ টাকা পেলে একটা গোটা প্রজন্ম সেই দাক্ষিণ্যের প্রতি অনুগত হয়ে থাকবে। প্রশ্ন করবে না, যুবসমাজের ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সর্বোপরি নির্ভরশীলতা বাড়বে। নাগরিক থেকে তাঁরা ‘ভোক্তা’য় পরিণত হবে। কর্মসংস্থানের দাবির জায়গায় বসে যায় কিস্তির প্রত্যাশা। স্বপ্নের বদলে আসে ফর্মের নম্বর।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা মানসিক। একটা গোটা প্রজন্ম এই ভাতার (Yuva Saathi Prakalpa) উপর নির্ভরশীল হয়ে অকর্মণ্য হয়ে পড়বে। উদ্যোগ, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, লড়াইয়ের মানসিকতা—সবই ক্ষয়ে যায়। আত্মসম্মান থাকবে না, উদ্যমহীন দয়া-নির্ভর এক পঙ্গু যুব সমাজ তৈরি হবে। প্রশ্নটা তাই ১৫০০ টাকা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা ভবিষ্যৎ নিয়ে।

বাংলা কি এমন এক সমাজ গড়তে চায়, যেখানে যুবসমাজ কাজ চায় না, ভাতা চায়? নাকি এমন এক বাংলা, যেখানে ভাতা নয়—কাজই হবে মর্যাদার মূল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলা। কিন্তু ইতিহাস বলে—যে সমাজ তার যুবসমাজকে দাঁড় করাতে শেখায় না, শুধু লাইনে দাঁড় করায়—সে সমাজ একদিন নিজেই হাঁটতে ভুলে যায়।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন