SPECIAL FEATURE
Aaj lndia Desk, সুরভী কুন্ডু: গতকাল রাতের বৃষ্টি আপনার জন্য সুখকর হলেও জানেন কি বৃষ্টি কাল ঠিক কত টা পেটে লাথি মেরেছে আলু চাষিদের (Potato Farmers)? জানলে অবাক হবে পশ্চিমবঙ্গের বুকে শত শত চাষির চোখের জল কাল কের বৃষ্টির জলে থেকে কম কিছু না । একদিকে চাষের অতিরিক্ত ফলন, আলুর দাম নিয়ে নাজেহাল ছিল চাষিরা এরই মাঝে গোঁদের উপর বিষফোঁড়া বৃষ্টি। সব মিলিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি ।
তবে চাষিরা আবহাওয়াকে মোটে দোষ দিচ্ছে না, তাদের দাবি চাষের কাজ অনেক দিন আগেই শেষ হয়েছে আলু মাঠে ফেলে রাখতে হয়েছে শুধু কোল্ড স্টোরেজ রাখাটাই সমস্যা। Aaj Inida-র সাংবাদিক সরাসরি চাষিদের কোল্ড স্টোরেজ আলুর রাখার সমস্যার কথা জানতে চাইলে তাদের বক্তব্য আলুর অতিরিক্ত ফলনে আর সম্ভব হচ্ছে না নতুন আলু সংরক্ষণের, কল্ডস্টোর গুলোর দাবি পর্যাপ্ত জায়গার অভাবেই এই পরিস্থিতি।
আরামবাগের এক আলু ব্যবসায়ী সন্দীপ কুন্ডু বলেন ‘পরিস্থিতি ভোটের মুখে জটিলতা বাড়াচ্ছে , চাষিরা দিন রাত মাঠে পরে থাকছে দু টো টাকার জন্য, বাজারে আলুর দাম তলানিতে, দেনায় ডুবছে চাষিরা, শাসক -বিরোধী ভোটের আগে আসে কাজের সময় ফের লুকিয়ে পরে, মিথ্যে আশ্বাসেই দিন কাটাচ্ছি’! তবে তিনি এও বলেন, ‘আমি আশাবাদী হয়তো ভালো কিছু হবে, যা চাষীদের জন্য সুখকর হলেও হতে পারে।’ তবে এই প্রসঙ্গ আসতেই আর এক আলু চাষি (Potato Farmers) সুশীল কুন্ডু ক্ষোভ উগরে বলেন, ‘ভোটের আগে এই রকম মিথ্যে প্রতিশ্রুতি অনেক দেয় কাজ কি হয়?’
অতীতের ঘটনা টেনে তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘দিদি তো বলেছিলেন চাষিদের থেকে তিনি আলু নেবেন ১০ দিন হয়ে গেলো এক কেজিও আলু নিয়েছে?’ পাশাপাশি তিনি এও বলেন ‘১০০০-১৫০০ টাকার ভাতা দিয়ে চাষি দের পেট ভরবে না , বউয়ের সোনা বন্ধক রেখে চাষ করেছি দিন শেষে যদি আলুর দাম না পাই তাহলে ধার শোধ করব কি ভাবে! পরিস্থিতি যে পর্যায়ে যাচ্ছে গলায় দড়ি দিতে হবে।’
এ-তো গেলো হুগলির দৃশ্য, চাষিরা বলছে ২০% চাষির ফসল এখনোও জমিতেই পরে আছে, এই পরিস্থিতিতে আলু রোদ-বৃষ্টি র জেরে মাঠেই বস্তা পচা হচ্ছে। বাঁকুড়ার চাষি অনুপ পালের দাবি, ‘মানুষ বোকা না , বুঝতে শিখেছে, বাম আমলে আলুর এত খারাপ পরিস্থিতি হতো না, আজ যদি ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খন্ডের আলু যেতো তাহলে এত খারাপ পরিস্থিতি কখনোই হত না, ২৪ শে ঘটনা চাষিরা ভুলে যাইনি, ওই সময় যদি বাংলার সরকার ওড়িশা কে আলু দিতে রাজি হতেন তাহলে আজ পরিস্থিতিটা বিপরীত হতো। শাসক শিবির আদতে মেরে ফেলছে চাষিদের,’ তিনি এও বলেন বঙ্গের বাজারে আলুর (Potato Farmers) চাহিদা কি কম?
জমির তো অভাব নেই চাইলে তো পারতেন আলুর আনুষাঙ্গিক শিল্প তৈরি করতে ,এই যেমন ধরুন আলুর চিপ,পশ্চিমবঙ্গের তো আলু সহজলভ্য এই ধরনের শিল্প হলে চাষিদের ও লাভ হয় ,তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন বিগত ১০ বছরে উনি কটা ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করেছেন ?’
আপনি কি আশা করেন বদলের পরিবর্তন আসবে?
আমাদের তরফ থেকে এই প্রশ্ন করাতে উনি বলেন ‘ দুর মশাই রাখুন তো , এক পাল্লায় সবাই সমান কেও ভালো না ,’ ।
অন্যদিকে বর্ধমানের চিত্র টা আরো ভয়ঙ্কর সাতগাছিয়ার বাসিন্দা দিপু প্রামাণিক বলেন , ‘৩০-৩৫% মানুষের এখন ও আলু মাঠে পরে আছে , চাষ ছেড়ে দিতে হবে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে , পরিস্থিতি খুব খারাপ, সাধারন মানুষ কে দেখার কেও নেই ‘ ।
তাহলে , ঘটনা টা পুরো স্পষ্ট সাধারন মানুষের কথা শোনার বা ভাবার মত কেও নেই। বাংলার চাষি আজ আর শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বাঁচেনা। বৃষ্টি হবে কি না, খরা আসবে কি না এই অনিশ্চয়তা তার জীবনের অংশ ছিল সবসময়ই। কিন্তু আজকের লড়াইটা অন্য জায়গায়। এখন সে লড়ছে বাজারের সঙ্গে, নীতির সঙ্গে, আর সবচেয়ে বড় কথা রাজনৈতিক উদাসীনতার সঙ্গে। এক সময় প্রকৃতি ছিল সবচেয়ে বড় শত্রু। ফসল নষ্ট হলে বলা যেত “ভাগ্যের দোষ”।
কিন্তু আজ ফসল ভালো হলেও চাষির মুখে হাসি নেই। কারণ উৎপাদন বাড়লেই দাম পড়ে যায়। পরিশ্রম বাড়ে, লাভ কমে এই অদ্ভুত সমীকরণে বন্দি হয়ে পড়েছে কৃষক সমাজ। বাজার যেন চাষির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। যখন ফলন কম ,দাম বাড়ে, কিন্তু চাষির ঘরে ফসল থাকে না। যখন ফলন বেশি দাম পড়ে যায়, তখন তার পরিশ্রমের মূল্যই থাকে না। নীতির ক্ষেত্রেও একই ছবি।
কাগজে কলমে প্রকল্প, ভাতা, সহায়তা সবই আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সুবিধা কতটা চাষির হাতে পৌঁছায়, সেটাই বড় প্রশ্ন। কোল্ড স্টোরেজের অভাব, সংরক্ষণের সমস্যা, ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা না থাকা এসব কি নতুন সমস্যা? না, বছরের পর বছর একই গল্প।
আর রাজনীতি? ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা, ভোটের পরে নীরবতা।চাষির কষ্ট তখন আর খবর থাকে না, থাকে শুধু সংখ্যা কত ভোট, কত আসন।সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো চাষির আশা ভেঙে যাচ্ছে।যে মানুষটা মাটিকে বিশ্বাস করে বেঁচে থাকে, সে আজ বলছে,’চাষ ছেড়ে দিতে হবে।’ এটা শুধু একটা পেশার সংকট নয়, এটা একটা সমাজের সংকেত।
কারণ চাষি হারিয়ে গেলে শুধু ফসল নয়, হারাবে খাদ্য নিরাপত্তা, হারাবে গ্রাম, হারাবে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তাই প্রশ্নটা খুব সোজা কিন্তু অস্বস্তিকর ,চাষিরা কি শুধু সহানুভূতির বিষয়, নাকি নীতির কেন্দ্রে আসার যোগ্য? আর যদি আজও উত্তর না মেলে, তাহলে হয়তো কাল আর প্রশ্ন করার মতো চাষিই থাকবে না।


