SPECIAL FEATURE: বৈশাখের প্যাচপ্যাচে গরমে কালীঘাটের ছোট্ট বাসভবনে পায়চারি করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল দেওয়ালে সাঁটা নন্দীগ্রামের একটা মানচিত্রের দিকে। ২০২১-এর পরাজয়ের ক্ষত তখনও দগদগে। প্রাক্তন সহযোগী থেকে বিজেপি-র দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা বনে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারীর কাছে অল্প ব্যবধানে হার। বিরোধীদের মুখ শুভেন্দু (Suvendu Adhikari) তাঁর সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাঁর তৃণমূল-কংগ্রেস সাম্রাজ্যকে উৎখাত করার জন্য জনগণকে একত্রিত করছিল। কিন্তু বাংলার লৌহমানবী মমতা সহজে হার মানার পাত্রি নন। ২০২৬-এর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন এবং ১৫ বছরের ক্ষমতার রাশ ধরে রাখতে তাঁর মোক্ষম চালের প্রয়োজন ছিল।
“অভিষেক”। হুগলির স্রোতের মত অবিচল কন্ঠস্বরে ভাইপোকে ঘরে ডাকলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। একটা গোটা প্রজন্মের আকাঙ্খার ভার কাঁধে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন টিএমসি-র তরুণ তুর্কি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩৮ বছর বয়সে দিদির পর দলের সবচেয়ে বড় নেতা, পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের দলের উত্থানের স্থপতি। মানচিত্রের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে সহজভাবে বললেন, “নন্দীগ্রাম—শুভেন্দু মনে করেন এটা তাঁর দুর্গ। আমরা এটা পুনরুদ্ধার করব”।
রাজনীতির উত্তাপে তখন তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করছে। খেলার নিয়ম তিনি জানতেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানকে প্রার্থী করে কংগ্রেসের শক্তিশালী নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে ধরাশায়ী করেছিলেন মমতা—একজন সেলিব্রিটি ওয়াইল্ডকার্ড, যা অভিজ্ঞ নেতাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল। শুভেন্দু ছিল আরও বড় শিকার। বিজেপি-র বাংলার পোস্টার বয়, কিন্তু কৌশল একই ছিল: চমক, জাঁকজমক এবং আধিপত্য।
টিএমসি-র গোপন সূত্রের মাধ্যমে কৌশলগতভাবে খবর ফাঁস করা হলো। সন্ধ্যার মধ্যে নন্দীগ্রামের গুজব ছড়িয়ে পড়ল: ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ এবং টিএমসি-র উদীয়মান তারকা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) শুভেন্দুর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠল। বিজেপি শিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল—শুভেন্দুর প্রচার, যা একসময় রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ছিল, হঠাৎ করেই নিজের এলাকা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। “সে ফাঁদে পড়েছে,” চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একজন টিএমসি কৌশলবিদ মুচকি হেসে বললেন। আর সিঙ্গুর বা সন্দেশখালিতে নিছক ‘জয়রাইড’ নয়।
মমতার ঘনিষ্ঠ মহলে তখন আরও বড় পরিকল্পনা নিয়ে গুঞ্জন চলছে। নন্দীগ্রামের জয় শুধুমাত্র ২০২১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধই নয় বরং উত্তরাধিকারের ইঙ্গিত দেবে। অভিষেককে প্রার্থী করা ছিল দাবার প্রথম চাল। যেখানে প্রতিটি ঘুঁটিকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। সেখানে জিতলেই তিনি উপমুখ্যমন্ত্রী—কিংবা এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—পদে উন্নীত হবেন, যা তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার রাশ পরিবারের হাতে আরও পোক্ত করবে। পুলিশ, দল এবং অর্থের নিয়ন্ত্রণ: সবকিছুই মমতা-পরবর্তী যুগের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
তমলুকের একটি জনাকীর্ণ জনসভায় অভিষেক (Abhishek Banerjee) মঞ্চে উঠলেন। বর্ষার বঙ্গোপসাগরের মত গর্জন করে উঠল জনতা। “তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের প্রাথমিক বছরগুলোতে দিদি নন্দীগ্রামের কৃষকদের জন্য লড়াই করেছিলেন। শুভেন্দু (Suvendu Adhikari) ২০২১ সালে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন আমরা যা শুরু করেছিলাম, তা শেষ করার পালা!” আতশবাজির আলোয় আকাশ আলোকিত হয়ে উঠল, তৃণমূল কর্মীরা নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত হলো, ১৫ বছরের ক্লান্তি ভোরের কুয়াশার মতো কেটে গেল।
বিজেপি সদর দফতরে টেবিলে সজোরে ঘুষি মারলেন শুভেন্দু। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে গর্জন করে বললেন, “এটা পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি”! কিন্তু বাইরে হাওয়া ঘুরে গিয়েছে। বিজেপি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তরুন, মুসলিম এবং গ্রামীণ ভোটারদের আকৃষ্ট করে ফেলেছে অভিষেকের “স্টার পাওয়ার”। টিভিতে তখন বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক তুঙ্গে: ভাগ্নে কি দৈত্যকে বধ করতে পারবে? নিজের ঘরে নিভৃতে বসে দেখছিলেন মমতা। তাঁর দৃঢ় মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। বাংলার সিংহাসনকে উত্তরাধিকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আগলে রেখেছিলেন তিনি এবং নন্দীগ্রাম ছিল সেই যোগ্যতার পরীক্ষাকেন্দ্র।
নির্বাচন এগিয়ে আসতেই স্পষ্ট হল লড়াইয়ের ময়দান। শুভেন্দুর উড়ে আসা কটূক্তির জবাবে দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলেন। যা দিদির অদম্য মনোভাবের প্রতিফলন। অবশেষে একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু কয়েকটি আসনের জন্য লড়াই করছিলেন না। তিনি এক উত্তরাধিকার তৈরি করছিলেন।


