স্নেহা পাল, আলিপুরদুয়ার : পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকায় নাম নিশ্চিত করতে গিয়ে গুরুতর আর্থিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছে রাজ্যের ক্ষুদ্রতম আদিবাসী জনগোষ্ঠী টোটোরা (Toto Tribes)।
কাজ বন্ধ দূরপ্রবাসী যুবকদের
আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) টোটোপাড়া গ্রামে বর্তমানে চলছে একের পর এক SIR শুনানি। নির্বাচন কমিশনের তরফে ‘logical discrepancy’ বা তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে বহু ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে ছয় বা তার বেশি সন্তানের তথ্য রয়েছে, তাদের যাচাইয়ের জন্য শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার আওতায় পড়েছেন ২৫ বছরের দিলিম টোটো (Dilim Toto) সহ বহু যুবক, যাঁরা সিকিম ও অন্য রাজ্যে দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন ।
দিলিম টোটোর মতো শ্রমিকদের ক্ষেত্রে একবার গ্রামে আসা-যাওয়ার খরচই প্রায় এক সপ্তাহের রোজগারের সমান। শুনানিতে হাজিরা দিতে এসে তাঁদের ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন দিকমান টোটো (Dikman Toto) (38)ও বিশান্ত টোটোর (Bishant Toto) (31) মতো আরও অনেকে।
স্থানীয় বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যা সামান্য বানান ভুল বা পারিবারিক ম্যাপিং সংক্রান্ত। টোটোপাড়ার BLO প্রকাশ প্রধান (Prakash Pradhan) ও সেভারানি মুর্মু টোটো (Sevarani Murmu Toto) জানিয়েছেন, কাউকেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে না। তবে গ্রামে পরিকাঠামোর অভাবে কাগজপত্র জোগাড় ও শুনানির প্রস্তুতিতে সাধারণ মানুষকে যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
প্রতিশ্রুতি শুধুই কাগজে
SIR শুনানির চাপের পাশাপাশি টোটোপাড়ার বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথাও তুলে ধরছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে যুবকদের ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে। বর্ষায় তোর্সা নদী (Torsa River) পারাপারের সমস্যায় গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উন্নত সেতু, সরকারি বাস পরিষেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তার কোনকিছুই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
এই গ্রামেরই বাসিন্দা পদ্মশ্রী প্রাপক ধনীরাম টোটো (Dhaniram Toto) ও শিক্ষিত টোটো যুবকদের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তাঁদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি থাকলেও জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে অনেক যুবক কৃষি বা ছোট উদ্যোগে নির্ভর করছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
ভোটাধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে একটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত উপজাতি জনগোষ্ঠীকে কাজ হারাতে হচ্ছে, যাতায়াতের সময় প্রাণের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে, দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতির মুখে পড়তে হচ্ছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তা, সুযোগ ও জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা বাস্তবে আদৌ কার্যকর হবে কিনা তাই নিয়ে চলছে জল্পনা।


