SPECIAL FEATURE
ভারতের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) আর নেই। রবিবার (১২ এপ্রিল, ২০২৬) মুম্বইয়ে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশজুড়ে। দীর্ঘ আট দশকের ক্যারিয়ারে ১২,০০০-রও বেশি গান গেয়ে ভারতীয় সঙ্গীতজগতে অমর হয়ে থাকবেন তিনি। তবে তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় -যা আজ আবার আলোচনায়-তা হল সুরকার আর ডি বর্মনের (Rahul Dev Burman) সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক, যা আজও বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনি হিসেবে ধরা হয়।
সুরের আড়ালে জন্ম নেয় প্রেম
ষাট-সত্তরের দশকে কাজের সূত্রে পরিচয়। তখনই বোঝা গিয়েছিল, আর ডি বর্মন-এর সুর আর আশা ভোঁসলে-র কণ্ঠ একে অপরের জন্য তৈরি। স্টুডিওর ভিতরে তাঁদের বোঝাপড়া ছিল প্রায় জাদুর মতো। পঞ্চমের (আর. ডি.) এক্সপেরিমেন্টাল সুর, আর আশার বহুমুখী কণ্ঠ-এই জুটিই বদলে দিয়েছিল বলিউডের গানের ধারা। “Piya Tu Ab To Aaja”, “Dum Maro Dum”, “Chura Liya Hai Tumne”-প্রতিটি গান যেন তাঁদের সম্পর্কের এক একটি অধ্যায়।
সামাজিক বাধা পেরিয়ে একসঙ্গে পথচলা
আশা ভোঁসলের প্রথম বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না। অল্প বয়সে বিয়ে, তারপর মানসিক অশান্তি-সবকিছু পেরিয়ে তিনি ফিরে আসেন নিজের পরিবার ও সংগীতের জগতে।
অন্যদিকে আর ডি বর্মনও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন। এই সময়েই একে অপরের মধ্যে খুঁজে পান ভরসা, বন্ধুত্ব এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসা।
১৯৮০ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বয়সের পার্থক্য, সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংশয়-সবকিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তবে তাঁদের সম্পর্ক ছিল প্রচারের আলো থেকে অনেকটাই দূরে-নিঃশব্দ, গভীর এবং পরিণত। আর ডি বর্মন আশাকে শুধু স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন শিল্পী হিসেবেও ভীষণ সম্মান করতেন। আর আশা, পঞ্চমের সুরে নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে পেতেন বারবার।
বিয়ের পরও তাঁদের সঙ্গীতযাত্রা থামেনি। বরং আরও পরিণত হয়। আর ডি বর্মন-এর সাহসী, আধুনিক সুরে আসা ভোঁসলের কণ্ঠ এনে দেয় এক নতুন বিপ্লব। গজল থেকে ক্যাবারে, রোমান্টিক থেকে পপ-সব ধারাতেই তাঁদের যুগলবন্দি ছিল অনন্য। তাঁদের কাজ প্রমাণ করে, প্রেম কখনও কখনও সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
মৃত্যুতেও থামেনি সেই বন্ধন
১৯৯৪ সালে আর ডি বর্মন-এর মৃত্যু আশার জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। বলা হয়, সেই আঘাত এতটাই গভীর ছিল যে তিনি শেষবার তাঁর স্বামীর মুখ দেখতেও পারেননি-কারণ সেই বিদায় মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। তারপরের দীর্ঘ সময়, আশা ভোঁসলে বেঁচে ছিলেন স্মৃতি আর সুরের মধ্যেই-যেখানে প্রতিটি গান যেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত পঞ্চমের কাছে।
শেষ বিদায়, কিন্তু অমর থেকে গেল প্রেম
আজ -র প্রয়াণের সঙ্গে যেন পূর্ণতা পেল সেই অসমাপ্ত প্রেমের গল্প। এটি শুধু এক গায়িকা ও এক সুরকারের সম্পর্ক নয়-এটি ছিল দুই শিল্পীর আত্মার মিলন, যেখানে ভালোবাসা, সঙ্গীত আর সৃষ্টিশীলতা এক হয়ে গিয়েছিল। সময় পেরিয়ে যাবে, প্রজন্ম বদলাবে-কিন্তু আশা ভোঁসলে ও আর ডি বর্মন-এর প্রেমকাহিনি চিরকাল বেঁচে থাকবে, তাঁদের গানের মতোই অমলিন হয়ে।
(পূরবী প্রামাণিক)


