22 C
Kolkata
Wednesday, April 8, 2026
spot_img

পরিসংখ্যানে নিরাপদ, বাস্তবে আতঙ্ক : কলকাতার নারী সুরক্ষায় বড় ফাঁক!

SPECIAL FEATURE 

পরিসংখ্যানের ঝকঝকে রিপোর্ট আর বাস্তবের অন্ধকার গলি এই দুইয়ের সংঘাতই আজ পশ্চিমবঙ্গের নারী নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যি তুলে ধরছে।

NCRB (National Crime Records Bureau)এর ২০২৫ সালের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, নারী নির্যাতনের হার নাকি কমেছে। শুধু তাই নয়, কলকাতাকে তুলে ধরা হয়েছে দেশের অন্যতম নিরাপদ শহর হিসেবে। “সেফ সিটি”এই তকমা প্রশাসনের সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছে। কিন্তু প্রশ্নটা ঠিক সেখানেই এই “নিরাপত্তা” কি কাগজে বন্দি,নাকি রাস্তায় হাঁটা মেয়েটির জীবনে সত্যি?কারণ বাস্তব ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে।

সোদপুর স্টেশনে মহিলা সাংবাদিকের উপর আক্রমণ, আর জি কর হাসপাতাল চত্বরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, কসবার ঘটনায় আতঙ্ক এই সব ঘটনা একের পর এক প্রমাণ করে দিচ্ছে, “সেফ সিটি” তকমা আর নাগরিক অভিজ্ঞতার মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে।

এখানেই উঠে আসছে আরও বড় প্রশ্ন পরিসংখ্যান কি সত্যিই অপরাধ কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি অভিযোগ কমার?অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, সংখ্যার এই পতনের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়, সামাজিক চাপ, কিংবা থানায় অভিযোগ দায়েরের প্রতি অনীহা। অর্থাৎ অপরাধ ঘটে, কিন্তু সব সময় তা রেকর্ডে ওঠে না। ফলে রিপোর্টে “উন্নতি” দেখা গেলেও, বাস্তবে নারীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খুব একটা বদলায় না।

দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট বাসে ওঠা, লোকাল ট্রেনে যাতায়াত, ফাঁকা রাস্তায় হাঁটা প্রতিটি মুহূর্তেই বহু নারী এখনও সতর্ক, অস্বস্তিতে, কখনও বা আতঙ্কে। রাতের শহর তো দূরের কথা, দিনের আলোতেও নিশ্চিন্তে চলাফেরা করা অনেকের কাছে এখনও বিলাসিতা।তাহলে কি “সেফ সিটি” এখন শুধু একটি প্রশাসনিক ট্যাগলাইন?একটি এমন সার্টিফিকেট, যা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না, কিন্তু রিপোর্টে খুব সুন্দর দেখায়?

আরও গভীরে গেলে প্রশ্নটা আরও অস্বস্তিকর যদি শহর এতটাই নিরাপদ হয়, তাহলে বারবার এমন নাড়িয়ে দেওয়া ঘটনা সামনে আসছে কেন?আর যদি এই ঘটনাগুলোই বাস্তব হয়, তাহলে পরিসংখ্যানের এই “সাফল্য” আসলে কাদের জন্য?শেষ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব একটা কঠিন সত্য সামনে আনে সংখ্যা দিয়ে নিরাপত্তা প্রমাণ করা যায়, কিন্তু নিরাপত্তা অনুভব করানো যায় না।যতদিন না রাস্তায় হাঁটা প্রতিটি মেয়ে নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় নিজের শহরকে নিজের বলে মনে করতে পারছে, ততদিন “সেফ সিটি” শুধু একটি দাবি বাস্তব নয়।

কলকাতা আবারও “সবচেয়ে নিরাপদ শহর NCRB (National Crime Records Bureau )এর রিপোর্টে চতুর্থবারের স্বীকৃতি। শুনতে গর্বের, বলার মতো সাফল্যও বটে। কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে আসল বিতর্ক এই “নিরাপত্তা” ঠিক কার জন্য?এবার এমন কিছু তথ্য সামনে তুলে ধরা যাক, যা “নিরাপদ শহর” তকমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় আসুন, একে একে সেই অস্বস্তিকর সত্যিগুলো দেখি।

সংখ্যার খাতায় কলকাতা যেন এক আদর্শ শহর ২০২৩ সালে প্রতি এক লক্ষ মানুষের মধ্যে গুরুতর অপরাধ মাত্র ৮৩.৯। ২০১৬ সালের তুলনায় যা অনেকটাই কম। নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যান বলছে উন্নতি, ২০২৩ সালে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ ১,৭৪৬, যা ২০২২ (১,৮৯০) ও ২০২১ (১,৭৮৩)-এর তুলনায় কম।শুধু কলকাতা নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গও নাকি এই নিরাপত্তার গ্রাফে এগিয়ে রাজ্যের অপরাধের হার ১৮১.৬, যেখানে জাতীয় গড় ৪৩৩। অর্থাৎ কাগজে-কলমে বাংলাই যেন অনেক বেশি নিরাপদ।

কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে গল্পটা অর্ধেকই বলা হয়।কারণ এই পরিসংখ্যানের চকচকে ছবির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন এই কমে যাওয়া সংখ্যা কি সত্যিই কমে যাওয়া অপরাধের ছবি?নাকি কমে যাওয়া অভিযোগের?গত এক বছরের ঘটনাগুলো অন্য কথা বলছে। বারবার নারী হেনস্থা, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, জনসমক্ষে নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে বাস্তব যেন সেই পরিসংখ্যানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।

তাহলে কি আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সংখ্যা কমছে, কিন্তু ভয় কমছে না?এই দ্বন্দ্বটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।তাই এবার তুলে ধরা যাক এমন কিছু ঘটনা, যা এই “নিরাপদ” তকমার ভিতটাই নাড়িয়ে দেয়।

দশমীর রাত উৎসবের শেষে যখন শহর ফিরছে স্বাভাবিক ছন্দে, তখনই সামনে আসে এক অস্বস্তিকর ছবি।গত ২ অক্টোবর, বাড়ি ফেরার পথে সোদপুর রেলওয়ে স্টেশনের সাবওয়েতে ২৩ বছর বয়সি এক মহিলা সাংবাদিক শ্লীলতাহানির শিকার হন। অভিযোগ, হিন্দিভাষী একদল মদ্যপ যুবক প্রথমে অশ্লীল মন্তব্য করে, তারপর প্রতিবাদ করতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে অশালীন স্পর্শ থেকে সরাসরি মারধর।সবচেয়ে আতঙ্কজনক দিকটা এখানেই সহায়তার জন্য বারবার চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।

স্টেশনে উপস্থিত নিরাপত্তারক্ষী, এমনকি জিআরপি কর্মীরাও তখন নীরব দর্শক।একটা ব্যস্ত রেলস্টেশন, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন সেখানেই যদি এমন ঘটনা ঘটে এবং সাহায্যের হাত না বাড়ে, তাহলে “নিরাপত্তা” ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে? পরবর্তীতে দমদম জিআরপি-র ওসি হস্তক্ষেপ করলে অভিযোগের ভিত্তিতে পদক্ষেপ শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে যে প্রশ্নটা তৈরি হওয়ার, তা তৈরি হয়েই গেছে ঘটনার পরে পদক্ষেপ, না ঘটনার আগে প্রতিরোধ কোনটা আসল নিরাপত্তা?

৯ অগাস্ট, ২০২৪ আর জি করের ধর্ষণকাণ্ড সামনে আসতেই রাজ্যের নারী নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে। ৩৬ ঘণ্টার ডিউটির পর অভয়ার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা গোটা বাংলাকে নাড়িয়ে দেয়।ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে রাত দখল কর্মসূচিতে শামিল হন। কিন্তু এত প্রতিবাদের পরও কি সত্যিই কিছু বদলেছে?কারণ, সেই ঘটনার পরও একের পর এক নারী নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসছে যা স্পষ্ট করে দেয়, প্রশ্নটা এখনও থেকেই গেছে।

গণধর্ষণ, সংঘবদ্ধ অপরাধ নিরাপত্তার মুখোশে ফাটল কল্যাণী থেকে বর্ধমান -নবদ্বীপ রোড গত এক বছরে একের পর এক গণধর্ষণের অভিযোগ যেন একই গল্প বলছে। কখনও স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ঘুরতে গিয়ে আক্রান্ত, কখনও বন্ধুর সঙ্গে বেরোনো কিশোরী পরিস্থিতি যাই হোক, লক্ষ্য একটাই নারী।কুলতলিতে নাবালিকা ধর্ষণ, কল্যাণীতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়, নিরাপত্তা শুধু সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। বাস্তবের মাটিতে তার পরীক্ষা হয় প্রতিদিন।নিরাপত্তাহীনতার বিস্তার সব জায়গায় প্রশ্ন হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ যে জায়গা গুলোকে সবচেয়ে নিরাপদ ভাবা হয়, সেখানেও যখন একের পর এক অভিযোগ ওঠে, তখন “নিরাপদ শহর”তকমাটা কতটা বাস্তব, তা নিয়েই প্রশ্ন জাগে।পরিসংখ্যান বলছে কলকাতা তুলনামূলক নিরাপদ ২০২১ সালে প্রতি লক্ষে ১০৩.৫, ২০২২-এ ৮৬.৫, আর ২০২৩-এ ৮৩.৯ গুরুতর অপরাধ। কিন্তু একই রিপোর্টই জানাচ্ছে, অ্যাসিড হামলার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষে ২০৭টি ঘটনার মধ্যে ৫৭টি এই রাজ্যে।সমাজকর্মী রিমঝিম সিনহার কথায়, আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায় ঘটনা কি সত্যিই কমছে, নাকি নথিভুক্ত হওয়া কমছে?কারণ এখনও বহু নারী জানেন না কোনটা অপরাধ, কীভাবে অভিযোগ করতে হয় ফলে অনেক ঘটনাই থেকে যায় অন্ধকারে।

অন্যদিকে সমাজকর্মী শতাব্দী দাশ আরও কড়া ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন কামদুনি, হাঁসখালির মতো ঘটনার পরও যদি “নিরাপদ শহর”তকমা দেওয়া হয়, তাহলে সেটি কি বাস্তব, নাকি তৈরি করা একটি ইমেজ?আর যখন শীর্ষস্তর থেকেই ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের অভিযোগ ওঠে, তখন কি সব অপরাধ আদৌ সামনে আসে?শেষ প্রশ্নটাই সবচেয়ে কঠিন ।পরিসংখ্যান হয়তো স্বস্তি দেয়, কিন্তু বাস্তব কি সেই স্বস্তিকে সমর্থন করে?

কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গকে সত্যিই নিরাপদ করতে হলে শুধু রিপোর্ট নয় প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ, সচেতনতা, আর এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি নারী নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারেন। ততদিন নিরাপদ শব্দটা হয়তো শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

                                              ( সুরভী কুন্ডু)

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন