SPECIAL FEATURE
রবিবারের ‘মায়া ভরা’ রাত। নেতাজি ইন্ডোর তখন দর্শকে পরিপূর্ণ। মঞ্চের উপর দুটি মানুষ। একজনের হাতে সেতার, অন্যজনের কন্ঠ। এমন সুর-সন্ধ্যা তো কত না দেখেছে বাঙালি, কলকাতাবাসী। তবুও সুরপ্রমীদের কাছে রবিবারের রাতের ‘মায়া’ যেন কাটছে না। মঞ্চের উপর ওই দুজন কারা? একজন কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞ পন্ডিত রবিশঙ্করের কন্যা অনুষ্কা শঙ্কর (Anoushka Shankar) এবং অপরজন মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের মাটির ছেলে অরিজিৎ সিং (Arijit Singh)? না কি অন্য কিছু?
ঘোর কাটেনি এখনও…
সুর কী? কেবল কিছু শব্দকে ছন্দে গেঁথে প্রাণ দেওয়ার নাম? না, সুর তার চেয়েও বহু দূরের কিছু। সুর হলো জাগতিকতার সীমা পেরিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের এক নীরব আহ্বান। গতকাল যারা সেই আহ্বানের সাক্ষী হলো, হাজার হাজার মানুষের ভিড়েও তাদের মনে হয়েছিল—চারপাশে কেউ নেই, কিছু নেই। এই নশ্বর দেহটুকু নিয়ে আমি বসে আছি একা, দু’টি স্বর্গীয় শক্তির মুখোমুখি।
একজনের সেতারের ঝঙ্কার আমার অন্তরের গোপন অলিগলিতে ঢুকে পড়ছিল, যেখানে জমে আছে অব্যক্ত যন্ত্রণা, অচেনা আনন্দ, চাপা ক্ষোভ আর নীরব হতাশা। আর সেই স্পর্শে জেগে ওঠা আবেগগুলোকে অন্তরের গোপন কুঠুরি থেকে আলতো করে তুলে শূন্যে মিলিয়ে দিচ্ছিল অপরজনের কণ্ঠ। সেই কণ্ঠ যেন আমারই। সেই শব্দগুলো আমারই। ওই দুই ঐশ্বরিক শক্তি আয়নার মতো আমার সামনে আমাকে তুলে ধরেছিল—নগ্ন, সত্য, নির্ভার। এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে ফেলেছিল আমাকে।
ওটা সেতারের সুর ছিল না—ওটা ছিল আমার না বলা কথা। ওটা গান ছিল না—ওটা ছিল আমার আত্মার স্বীকারোক্তি। সেই ঐশ্বরিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো গোটা শহর। সুরের স্রোতে রাত গড়িয়ে গেল, ভোর এলো অজান্তেই। তারপর শুরু হলো চেনা জীবন—রোজনামচার ব্যস্ততা, বাস্তবের দৌড়, সোমবার সকালের ক্লান্ত শ্বাস।
তবুও কেন কাজে বসে এখনো কানে বাজে, “মায়া ভরা রাতি…”? হয়তো সেই রাত কোনোদিন ফুরোয়নি। হয়তো তা মিশে গেছে সবার শরীরে, মনে, অন্তরে—নীরবে, গভীরে।
পৃথিবীতে হাতে গোনা কিছু শিল্পীই আছেন, যারা মানুষকে তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারেন। গতকাল সেই সুরের সন্ধ্যায় সবাই যেন এক অদৃশ্য আয়নায় নিজেকে দেখেছে, নতুন করে নিজেকে চিনেছে। নিজের সমস্ত যন্ত্রণার ভার শূন্যে সমর্পণ করেছে। আজ তাই সবকিছু যেন হালকা। যেন আবার নতুন করে জীবন শুরু হয়েছে।
দেবী (যাজ্ঞসেনী)


