SPECIAL FEATURE
একদা যে বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত হতো ‘হট্টিমা টিম টিম’ কিংবা ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’-র সহজ সরল ছন্দে, আজ সেই পলিমাটির দেশেই রচিত হচ্ছে এক নতুন ইতিহাস। সাহিত্যের আঙিনায় চিরকালই ছড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। সে কখনও ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি হয়ে শৈশবের চোখে স্বপ্ন বুনেছে, আবার কখনও সুকুমার রায়ের কলমে হয়ে উঠেছে শাণিত সামাজিক ব্যঙ্গ। কিন্তু সময়ের চাকা ঘোরার সাথে সাথে আমাদের চারপাশ আজ প্রযুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত। আধুনিক এই যুগের যান্ত্রিক গদ্যকে যদি সাহিত্যের পেলব ছন্দে গেঁথে ফেলা যায়? ঠিক এই আপাত অসম্ভব কাজটিই সম্ভব করেছেন যাদবপুরের প্রাক্তনী এবং পেশায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সুপ্রিয় সেনগুপ্ত।
প্রযুক্তিবিদ্যার জটিল মারপ্যাঁচকে তিনি সহজ করে তুলেছেন অন্ত্যমিলের জাদুতে। জন্ম নিয়েছে বিশ্বের প্রথম বাংলা ‘টেকনো-রাইমস’ বা ‘প্রাযুক্তিক ছড়া’। তাঁর সৃজনী সত্তার নাম দিয়েছেন— ‘কারিগরি কবিয়াল’। ‘কারিগরি’ অর্থাৎ প্রযুক্তি আর ‘কবিয়াল’ অর্থাৎ যিনি মুখে মুখে ছন্দ বাঁধেন। এই নামকরণের সার্থকতা ধরা পড়ে তাঁর কলমের আঁচড়ে, যেখানে ভোল্টেজ থেকে কারেন্ট—সবই এখন সুরের ছন্দে প্রাণ পায়।
বর্তমান যুগ কৃত্রিম মেধার। আজকের শিশুরা যেখানে শৈশব থেকেই প্রযুক্তির হাত ধরে বড় হচ্ছে, সেখানে পাঠ্যবইয়ের কঠিন ফিজিক্যাল সায়েন্স তাদের কাছে অনেক সময় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই ভয়কে জয় করতেই সুপ্রিয় বাবু উপহার দিয়েছেন ৫০-এর বেশি প্রাযুক্তিক ছড়া। এটি কেবল বিজ্ঞানের পাঠ নয়, বরং বিজ্ঞানের এক নতুন রূপকথা। উদাহরণ হিসেবে তাঁর ‘ভোল্টেজ’ ছড়াটির দিকে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত সারল্য:
“High থেকে Low যাবে তড়িত গতিধারা,
এটুকু বুঝে গেলেই Voltage বোঝা সারা।”
আবার ‘সুইচ’ নিয়ে তাঁর সহজ বয়ান:
“বৈদ্যুতিক সার্কিটকে/ ভাঙা কিংবা গড়া/
ভেবে তুমি পাচ্ছ না কূল/ চক্ষু ছানাবড়া।”
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এবং নেশায় ভয়েস আর্টিস্ট সুপ্রিয়বাবুর এই উদ্যোগের স্বীকৃতি মিলতে দেরি হয়নি। ভারত সরকারের ১৯৫৭ কপিরাইট আইনের অধীনে এই ‘টেকনো-রাইমস’ পেয়েছে বিশেষ স্বীকৃতি। এমনকি, ‘ইন্ডিয়ান বুক অফ রেকর্ডস’-এ নাম ওঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
সুপ্রিয় সেনগুপ্তের এই কাজ কেবল একটি একাডেমিক গবেষণা নয়, এর গভীরে মিশে আছে এক গভীর আবেগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাঁর ভাষায়, “সমাজে প্রযুক্তি নিয়ে সম্যক জ্ঞানের বড় অভাব। আমি চেয়েছিলাম এমন কিছু রেখে যেতে যা চিরকাল মানুষের মনে থাকবে, সমাজকে পথ দেখাবে। এই ছড়াগুলি সেই স্বপ্নেরই ফসল।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপ্রিয়বাবুর এই সৃষ্টি আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। কঠিন বিষয়কে সহজে উপস্থাপনের এই কৌশল ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ দূর করবে, বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের মেধাবী প্রাণগুলো যারা ভাষাগত জটিলতায় বিজ্ঞান থেকে দূরে সরে থাকে, তারা ফিরে পাবে নতুন অনুপ্রেরণা।
আজ হয়তো ছড়াগুলি তড়িৎবিদ্যার আঙিনায় সীমাবদ্ধ, কিন্তু সুপ্রিয় সেনগুপ্ত যে নতুন পথের দিশা দেখালেন, সেখানে ভবিষ্যতে কম্পিউটার সায়েন্স থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের নানা শাখায় পা ফেলবেন আগামীর সাহিত্যিকরা। বাংলার মাটি থেকে শুরু হওয়া এই ‘টেকনো রাইমস’ কালক্রমে হিন্দি, তামিল বা তেলুগু ভাষাতেও ছড়িয়ে পড়বে—এমন আশা রাখা মোটেও অলীক নয়। সাহিত্যের অন্দরে বিজ্ঞানের এই নতুন সূর্যোদয় বাংলার বুকে চিরকাল এক অনবদ্য কীর্তি হিসেবে অম্লান থাকবে।


