SPECIAL FEATURE
স্নেহা, কলকাতা: একজন সাংবাদিকের কাজই প্রশ্ন করা। কিন্তু সেই প্রশ্ন যদি ক্ষমতাশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যায়, তখন সেই কাজই হয়ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গত এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ দেখলে স্পষ্ট হয়, বিশ্ব জুড়ে সরকারি দুর্নীতি প্রকাশের পরই একের পর এক সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ২,২৫৬ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন (Journalists killed) এবং এই ক্রমাগত সাংবাদিক হত্যায় অন্যান্য দেশের সাথে জুড়ে আছে ভারতের নাম।
কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ৭৫৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ভারতেও একাধিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ভারতে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ৩০-এর বেশি। অন্যদিকে, RSF এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে নিহত ২৮ জন সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ১৩ জন পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় যেমন অবৈধ বালু খনন, জমি দখল এবং শিল্প প্রকল্পের জন্য খনিজ উত্তোলন বিষয়ে তদন্ত করছিলেন। এই ঘটনাগুলোর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তথাকথিত ‘স্যান্ড মাফিয়া’ বা অবৈধ বালু উত্তোলন চক্র। স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এসব অপরাধের বিচার হয় না বলে অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের।
এক দশকের রক্তাক্ত তালিকা
২০১৫ সালে অবৈধ বালু খননের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশ নিয়ে কাজ করতে থাকা উত্তরপ্রদেশের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক জগেন্দ্র সিংকে খুন করা হয়। ২০১৬ সালে উত্তরপ্রদেশে একই কাজে যুক্ত থাকা সাংবাদিক করুণ মিশ্র এবং বিহারে রঞ্জন রাজদেবকে মোটরবাইকে আসা হামলাকারীরা গুলি করে হত্যা করে। ২০১৭ সালে বেঙ্গালুরুতে ভুয়ো তথ্য ও উগ্র রাজনীতির সমালোচনা করায় সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে তাঁর বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়।
২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশে স্যান্ড মাফিয়ার দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে থাকা টেলিভিশন সাংবাদিক সন্দীপ শর্মাকে একটি ডাম্পার ট্রাক চাপা দেয়। সেই সময়ও অভিযোগ উঠেছিল যে এটি ইচ্ছাকৃত হামলা। একই ভাবে একই কাজে যুক্ত ২০২০ সালে লখনউয়ে সাংবাদিক শুভম মণি ত্রিপাঠী, বিহারে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সুভাষ কুমার মাহতো, মহারাষ্ট্রে রিয়েল এস্টেট লবির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে থাকা শশীকান্ত ওয়ারিশে নিহত হন। (Journalists killed)
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছত্তীসগঢ়ে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক মুকেশ চন্দ্রাকরের দেহ একটি সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার হয়। এর ঠিক আগেই তিনি একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন। সেই রিপোর্টের পর সরকারি তদন্ত শুরু হয়। পরে পুলিশের তদন্তে তাঁর হত্যার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও সেই ঘটনাটিও দ্রুত ফাইল চাপা পড়ে। তবে তা বিশেষ আশ্চর্যের নয়। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মতে, সাংবাদিক হত্যার ৯০ শতাংশের বেশি ঘটনায় অপরাধীরা শাস্তি পায় না।
গণতন্ত্রে প্রশ্নের জায়গা কোথায়?
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্রে সাংবাদিকতার মূল কাজই হলো ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি, অপরাধ বা প্রাকৃতিক সম্পদের লুট নিয়ে প্রশ্ন তোলা। অথচ সেই কাজ করতে গিয়েই প্রাণ নাশ হচ্ছে সাংবাদিকদের (Journalists killed)। World Press Freedom Index ২০২৫ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে ‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক’ দেশ ভারতের স্থান ১৫১তম। ২০২৬ এ দাঁড়িয়ে তবে সত্য প্রকাশের পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে, কিন্তু সেই প্রশ্ন উচ্চারণ করার সাহস হয়ত আর থাকবে না।


