SPECIAL FEATURE
Aaj India Desk, নয়া দিল্লি : প্রায়শই ‘One India One Nation’ এর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সমাজমাধ্যম। সবাইকে সাম্য , মৈত্রী ও সম্প্রীতির বুলি আওড়াতে দেখা গেলেও বাস্তবে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশের রাজধানীতেই উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষকে প্রকাশ্যে অপমান ও বর্ণবিদ্বেষের শিকার হতে হয়। সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই অস্বস্তিকর সত্যই আবার সামনে আসে।
সম্প্রতি দিল্লিতে একটি আবাসনে বাস করা অরুণাচলের কিছু মেয়েকে “মোমো বিক্রি করা”, “ম্যাসাজ পার্লারে কাজ করা”, “যৌন কর্মী” ইত্যাদি বলে কটাক্ষ করে অপমান করা হয়। এমনকি “নর্থইস্টের মানুষ নিকৃষ্ট” বলেও মন্তব্য করা হয়।
দৈনন্দিন জীবনে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা
তবে এগুলি নতুন নয়। এর আগেও বহুবার পুরো ভারত জুড়ে উত্তর পূর্ব ভারতের মানুষদের অকারণেই তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পোশাক, সর্বোপরি জাতি নিয়ে নানা ভাবে অপমান করা হয়েছে। “চাইনিজ”, “চিং চুং” প্রভৃতি শব্দে যেন বার বার বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে তাঁরা ভারতীয় নন। উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মেট্রো শহরগুলিতে তাঁদের প্রায়ই ‘বিদেশি’ হিসেবে দেখা হয়। চেহারা বা খাবার সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে কটূক্তি, স্টেরিওটাইপ এসব তাঁদের নিত্য অভিজ্ঞতার অংশ। তাঁদের “ভারতীয়” হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যে অনীহা দেখা যায় তা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্যই উদ্বেগজনক।
সাফল্যে বদলে যায় ভাষা
অন্যদিকে, ক্রীড়া বা সংস্কৃতিতে সাফল্যের মুহূর্তে চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো। যখন মেরি কম অলিম্পিকে পদক জেতেন, বা বাইচুং ভুটিয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যায় “প্রাউড টু বি ইন্ডিয়ান” বার্তায়।
স্লোগানের আড়ালে বাস্তবতা
শুধুমাত্র সাফল্যের মুহূর্তেই উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের ‘ভারতীয়’ হিসেবে মনে পড়া এই ‘সুবিধাবাদী দেশপ্রেম’ আসলে বর্তমান সামাজিক বৈষম্য ও মানসিক দূরত্বেরই প্রতিফলন। উত্তর-পূর্ব ভারতীয়দের প্রতি এই আচরণ আর দ্বিচারিতা বজায় থাকা সত্ত্বেও সরকারের ‘One India One Nation’ এর স্লোগান ও গর্ব একপ্রকার বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছু নয়। যখন বাস্তবে সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না, তখন এই ধরনের ঐক্যের দাবি শুধুমাএ কাগুজে আদর্শ ও ভোট আমদানির মাধ্যম বলেই মনে হয়।
প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু স্লোগান নয়, দৈনন্দিন জীবনে সমান আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। এই ব্যবধান যতদিন না কমছে, যতদিন সরকারের অবহেলা ও সাধারণ মানুষদের বৈষম্যমূলক আচরণ না থামছে, ততদিন ভারত আদৌ ‘One Nation’ হয়ে উঠতে পারবে না।
এই সমস্যার মূলে রয়েছে সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক দূরত্ব। শিক্ষা, মিডিয়া ও সামাজিক আলোচনায় উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের অবদানকে স্থান না দেওয়া এর অন্যতম কারণ।প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব, দৈনন্দিন জীবনে গড়ে ওঠা স্টেরিওটাইপ এবং সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এই বৈষম্যকে বারবার জিইয়ে রাখে। ফলে আইন বা নীতির কথা যতই বলা হোক, সমাজের গভীরে প্রোথিত এই মনোভাব সহজে বদলাবে এমন আশা প্রায় অবাস্তব। তবু আশা রাখা যায় যে সমাজের একাংশের সচেতনতা, প্রতিবাদ এবং সংহতির মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে লড়াই গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারতের পথ দেখাতে পারে।


