SPECIAL FEATURE
বাংলার ভোটযুদ্ধ আবারও তেতে উঠেছে, আর এই ভোটযুদ্ধ যতই এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট যেন হচ্ছে -লক্ষ্মীর ভান্ডার (Lokkhir Bhandar) শুধু একটা সরকারি প্রকল্প নয়, শাসক দলের অন্যতম বড় অস্ত্রও। যদিও কারো কারো কাছে এটি জনকল্যাণের প্রতীক, আবার অনেকের চোখে এটি শুধুই একটি জনকল্যাণ প্রকল্প নয়, বরং এটাই শাসকদলের সবচেয়ে বড় “ব্রহ্মাস্ত্র”। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, এই অস্ত্র কি সবসময় নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? নাকি কখনও কখনও তা বুমেরাং হয়ে উঠছে?
ভোটের প্রচারে যখন প্রার্থীরা জনতার মন জিততে নানান কৌশল নিচ্ছেন -কেউ রান্না করছেন, কেউ চুল-দাড়ি কেটে দিচ্ছেন, কেউ আবার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজে হাত লাগাচ্ছেন -ঠিক তখনই গীতা দাস বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। অনুনয়-বিনয়ের বদলে সরাসরি মঞ্চ থেকেই হুঁশিয়ারি -“যার দেওয়ালে পদ্মফুল, তার লক্ষ্মীর ভান্ডার (Lokkhir Bhandar) বন্ধ।”
পূর্ব বর্ধমানের মেমারি থেকে উঠে আসা এই মন্তব্যই এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। মেমারিতে এবারের তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন রাসবিহারী হালদার। আর তারই দলের নেত্রী গীতা দাস ভোটের মঞ্চে দাঁড়িয়ে হুঁশিয়ারি দেন, “জোড়া ফুলে ভোট না দিলে লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ”। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক অন্য রাজনৈতিক মনোভাব, যেখানে ভোটার মানে শুধুই প্রাপক, আর প্রকল্প যেন হয়ে উঠছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। তার ভাষায়, অনেকেই “লক্ষীর ভান্ডারের (Lokkhir Bhandar) টাকা নিচ্ছেন, আবার দেয়ালে পদ্মফুল আঁকছেন”। আর সেখান থেকেই সরাসরি হুঁশিয়ারি – “যার বাড়িতে পদ্ম আঁকা, তার বাড়িতে আগে ‘সাফাই’ হোক, না হলে এই প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হবে”।
এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন -একটি সরকারি প্রকল্প কি কোনও ব্যক্তি বা দলের ব্যক্তিগত ‘সম্পত্তি’? লক্ষ্মীর ভান্ডারের (Lokkhir Bhandar) টাকা কি কোনও নেতার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে যায়? নাকি এটা রাজ্যের ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থে চলা একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প?
যদি এটি সত্যিই রাজ্য সরকারের একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হয়, যা করদাতাদের টাকায় পরিচালিত। তাহলে কোনও নেত্রী কীভাবে এর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে এমন সরাসরি হুমকি দিতে পারেন?
গীতা দাসের আরও দাবি -তৃণমূল কর্মীরাই নাকি লক্ষীর ভান্ডার (Lokkhir Bhandar) প্রকল্পের ফর্ম ফিল-আপ করে দিয়েছিল, তাই এই প্রকল্পের উপর তাদের একপ্রকার ‘নৈতিক অধিকার’ আছে। কিন্তু সেই যুক্তি কি গণতন্ত্রে টেকে? সাহায্য করা আর নিয়ন্ত্রণ করা -এই দুইয়ের ফারাক কি মুছে যাচ্ছে? নাকি এই যুক্তি ভোটারদের ‘ঋণী’ বানানোর রাজনীতি?
যদিও সংখ্যার হিসেবে মেমারিতে তৃণমূলের সাফল্য স্পষ্ট -২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ২৪ হাজারের লিড, আর ২০২৪-এর লোকসভায় তা বেড়ে ৩২ হাজার। কিন্তু এই বাড়তি ব্যবধানই কি আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, নাকি তৈরি করেছে এক ধরনের দম্ভ -যেখানে ভোটাররা আর নাগরিক নয়, বরং ‘নিশ্চিত সমর্থক’?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায় -নির্বাচন কি শুধু ভোট জেতার অঙ্ক, নাকি মানুষের আস্থা জেতারও লড়াই? আর সেখানেই বড় প্রশ্ন -লক্ষ্মীর ভান্ডার (Lokkhir Bhandar) যদি সত্যিই শাসক দলের ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ হয়, তবে তার এমন প্রয়োগ কি উল্টে বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে না?
তবে রাজনৈতিক দলগুলির সব সময় মনে রাখা উচিত যে গণতন্ত্রে জনতা কখনও ‘কেনা গোলাম’ নয় -তারা সিদ্ধান্ত নেয়, শাসক বেছে নেয়, আর প্রয়োজন হলে বদলেও দেয়। তাই মেমারির ঘটনা আরো একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ভোটাররা কি সত্যিই “কেনা গোলাম”? নাকি তারা সুযোগ পেলেই এই প্রশ্নের জবাব ব্যালট বাক্সে দিয়ে দেবে? -সেটাই এখন দেখার।
(পূরবী প্রামানিক)


