29 C
Kolkata
Sunday, April 5, 2026
spot_img

“সে আর নেই” এই অনুভূতির পেছনে কী ঘটছে আপনার মস্তিষ্কে

Aaj India Desk,সুরভী কুন্ডু: রাতগুলো কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেছে, তাই না?ঘুম আসে না ঠিকমতো। ফোনের স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে উঠলে বুকটা ধক করে ওঠে মনে হয়, “হয়তো সে…”কিন্তু না,এই যে অদ্ভুত যন্ত্রণা যেটা মনে হয় বুকের ভেতর কোথাও চাপা আগুন জ্বলছে এটা কি শুধুই কল্পনা?না, একেবারেই না।

Harvard University-এর একটি গবেষণা বলছে, আমাদের মস্তিষ্ক মানসিক কষ্ট (emotional pain) আর শারীরিক আঘাতের কষ্ট (physical pain) দুটোকে প্রায় একইভাবে গ্রহণ করে।অর্থাৎ, তুমি যে কষ্টটা অনুভব করছো, সেটা একদম বাস্তব। সেটা “মনগড়া” নয়, সেটা বায়োলজিক্যাল , সুতরাং এখনই তোমাকে মানসিক রোগী বলার চলে না ।

প্রেম: একটা রাসায়নিক ঝড়

ভালোবাসা আসলে শুধু একটা অনুভূতি নয় ,এটা তোমার শরীরের ভেতর ঘটে যাওয়া এক নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর রাসায়নিক বিপ্লব। যখন তুমি সত্যিই কারও প্রেমে পড়ো, তখন তোমার মস্তিষ্ক যেন নতুন করে প্রোগ্রাম হতে শুরু করে।একসাথে কাজ করতে থাকে কয়েকটি শক্তিশালী হরমোন ডোপামিন, যা তোমাকে অকারণেই সুখী করে তোলে;অক্সিটোসিন, যা তোমাকে তার সাথে অদৃশ্য এক বন্ধনে বেঁধে ফেলে সেরোটোনিন, যা তোমার মনের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে,

অ্যাড্রেনালিন, যা তার কথা ভাবলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা তৈরি করে আর টেস্টোস্টেরন বা ইস্ট্রোজেন, যা আকর্ষণকে আরও গভীর করে তোলে।এই সবকিছু মিলে তোমার ভেতরে তৈরি হয় এক ধরনের নেশা একটা মিষ্টি “হাই” যেখানে তার একটা মেসেজই তোমার দিনটাকে বদলে দিতে পারে,তার একটা হাসি তোমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।ধীরে ধীরে সেই হয়ে ওঠে তোমার অভ্যাস, তোমার স্বস্তি, তোমার নিরাপদ জায়গা।তুমি বুঝতেই পারো না কখন তোমার পৃথিবীর কেন্দ্রটা বদলে গেছে আর সেখানে জায়গা করে নিয়েছে শুধু একজন মানুষ।

ব্রেকআপ: এক ধরণের ‘উইথড্রয়াল সিনড্রোম’

কিন্তু হঠাৎ যখন সম্পর্কটা ভেঙে যায়, তখন শরীর যেন একটা ধাক্কা খায়।যে হরমোনগুলো তোমাকে ভালো রাখত, তারা হঠাৎ কমে যায়। আর শুরু হয় এক অদৃশ্য সংকট।এই অবস্থাকে অনেকটা “ড্রাগ উইথড্রয়াল”-এর সাথে তুলনা করা হয়।

তখন কী হয়?

১. স্ট্রেসের ঢেউ (Cortisol & Adrenaline)

হঠাৎ করে কর্টিসল আর অ্যাড্রেনালিন বেড়ে যায়। ফলে বুক ধড়ফড় , ঘুমের সমস্যা , হজমে গোলমাল ,শরীর ব্যথার মত সমস্যা দেখা দেয়।

২. আনন্দের শূন্যতা (Dopamine & Oxytocin কমে যাওয়া)

যে মানুষটা তোমার “ডোপামিন সোর্স” ছিল, সে আর নেই। তাই সবকিছু ফাঁকা লাগে। পৃথিবীটা যেন রঙ হারিয়ে ফেলে।

৩. সেরোটোনিন কমে যাওয়া

মন খারাপ যেন ছাড়তেই চায় না।একটা অদ্ভুত ভার যেটা ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় প্রতিটা মুহূর্তে।

কখনো কখনো এই মানসিক যন্ত্রণা এতটাই গভীর হয়ে ওঠে যে তা শুধু মনে আটকে থাকে না নেমে আসে শরীরের প্রতিটা কোণে। বুকের ভেতর হঠাৎ অদৃশ্য এক চাপ তৈরি হয়, যেন কেউ চেপে ধরে আছে নিঃশব্দে।শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, হালকা দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অনুভূতি হয় আর তুমি বুঝতেই পারো না, এটা ঠিক কোথা থেকে শুরু হলো।

এই অনুভূতিগুলোকে অনেকেই “অতিরঞ্জিত” বলে এড়িয়ে যায়,

কিন্তু সত্যিটা হলো এই কষ্ট একেবারেই বাস্তব। কিছু ক্ষেত্রে এই তীব্র আবেগের ধাক্কা শরীরকে এমনভাবে নাড়িয়ে দেয় যে “Broken Heart Syndrome”-এর মতো অবস্থাও তৈরি হতে পারে যেখানে হৃদযন্ত্র সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, ঠিক যেন সেটাও এই বিচ্ছেদের ধাক্কা সামলাতে পারছে না।তাই হৃদয় ভাঙা শুধু কবিতার ভাষা নয়,এটা কোনো রূপক নয় কখনো কখনো এটা সত্যিই শরীরকে অসুস্থ করে তোলে।অদৃশ্য এই ব্যথা, শব্দহীন এই যন্ত্রণা তবুও তার প্রতিটা স্পন্দন তুমি খুব স্পষ্টভাবেই অনুভব করো।

তবে এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় তোমার শরীরের ভিতরে কিছু শত্রু , যারা হতে পারে তোমাকে চিরতরে শেষ করে দেবে আবার কখনো তোমাকে অপরাধমূলক কাজকর্মের দিকেও এগিয়ে দিতে পারে। এই কারণে সুইসাইড বা ব্ল্যাকমেল এর মত কর্মে ধাবিত হয়ে থাকি আমরা , এই কর্মে লিপ্ত হবার জন্য তোমার শরীরের ভিতরে ওই হরমোন গুলোই দায়ী , কোন হরমোন , কিসের জন্য , ঠিক কতটা দায়ী ?

অন্ধকার দিক: প্রতিশোধ,হরমোন আর অপরাধ

সব মানুষ কষ্ট পায়,কিন্তু সবাই কষ্টকে একভাবে সামলাতে পারে না।কারও কারও ভেতরে এই ভাঙনটা চুপচাপ নীরব থাকে,আবার কারও ভেতরে সেটা ধীরে ধীরে রূপ নেয় রাগে, অভিমানে, আর প্রতিশোধের আগুনে।যে মানুষটাকে একসময় নিজের সবকিছু মনে হয়েছিল, হঠাৎ করে তার প্রতিই জন্ম নেয় তীব্র আক্রোশ।আর সেই আক্রোশ কখনো কখনো মানুষকে এমন জায়গায় ঠেলে দেয় যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। তখন কিছু মানুষ এমন কাজ করে বসে,যা শুধু একটা “ভুল” নয় বরং স্পষ্ট এক অপরাধ।

যেমন – সঙ্গীর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া।

এটা শুধু বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটা কারও ব্যক্তিগত সম্মানকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া।

কিন্তু কেন এমন হয়?

কারণ তখন মানুষ শুধু আবেগ দিয়ে নয়, তার শরীরের ভেতরের অস্থির রাসায়নিক ঝড় দিয়েও পরিচালিত হয় , টেস্টোস্টেরন বেড়ে গেলে ভেতরের আগ্রাসন মাথা তুলে দাঁড়ায়, মনে হয় “কিছু একটা করতেই হবে” কর্টিসল বাড়লে মস্তিষ্ক যেন ঝাপসা হয়ে যায়, ঠিক-ভুলের সীমারেখা আর স্পষ্ট থাকে না , সেরোটোনিন কমে গেলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, মুহূর্তের রাগই হয়ে ওঠে সিদ্ধান্ত ,আর ডোপামিন,

সেই বিকৃত অনুভূতি দেয় যেন প্রতিশোধেই আছে এক অদ্ভুত তৃপ্তি, তখন ব্যক্তি ক্ষতিতেই আনন্দ খুঁজে পায়।

আইন কী বলছে?

ভারতে কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ।

প্রযোজ্য আইনগুলো হলো:

১. Information Technology Act 2000 (Section 66E, 67, 67A)

২. Indian Penal Code (Section 354C, 499, 500)

তবে গবেষণা বলছি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আঘাত পেয়ে মানুষ নিজের ক্ষতিই বেশি করে , যে কারণে শরীরে আঘাত বা সুইসাইড এর মত কাজে লিপ্ত হয়। তবে এর জন্য দায়ী তোমার শরীরের ওই হরমোন গুলোই …

গবেষণা বলছে গোটা বিশ্বে প্রায় হাজারেরও বেশি যুবক যুবতী প্রতিদিন সুইসাইড করে থাকে ভালোবাসা বিচ্ছেদের কারণে ।কিছু ক্ষেত্রে এই মানসিক আঘাত মানুষকে খুব অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যায়।যেখানে মনে হয় সব শেষ।

এর পেছনেও কাজ করে শরীরের রাসায়নিক পরিবর্তন:

সেরোটোনিন কমে গেলে আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে

কর্টিসল বাড়লে সমস্যা বড় মনে হয়

ডোপামিন কমে গেলে জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়।

তবে ঘটনাগুলোকে শরীরের রাসায়নিক পরিবর্তন বলে ঝেড়ে ফেললে চলবে না । মনো বিশেষজ্ঞরা বলছে : সম্পর্কে থাকা ওই নির্দিষ্ট মানুষের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিতে হবে। আর এই অভ্যাস ৯০ দিন পর্যন্ত চালু রাখতে হবে। অর্থাৎ তোমার ব্রেন কে বুঝতে সময় দিতে হবে তুমি তাকে ছাড়া ও ভালো থাকতে পারো,

তোমার ব্রেনের হাইজিন মেন্টেন এর জন্য প্রয়োজনে সোশ্যাল মিডিয়া বা সোশ্যাল সাইট থেকে তাকে হাইড , মিউট বা ব্লক করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারো, গবেষণা বলছে এই সিদ্ধান্ত সঠিক , তুমি তার প্রোফাইল চেক করছো মানে ড্রাগের মতো এই নেশাকে তুমি আরেক ডোজ বাড়িয়ে দিচ্ছ। নিজের ব্রেন কে পরিবর্তন নিজেকেই করতে হবে । পাশাপাশি শরীর চর্চা ও প্রাণায়নের মত সুস্থ কাজকর্মে ধাবিত থাকতে হবে । এতে করে তোমার শরীর ও মন উভয়েই সুস্থ থাকবে।

 

 

 

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন