Aaj India Desk, কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল প্রতীক (TMC Symbol) শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির, নাকি বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) গোষ্ঠী—এই প্রশ্ন এখন রাজ্য রাজনীতিতে বড় হয়ে উঠেছে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন (By-election) ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই প্রতীক নিয়ে দুই শিবিরের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আগামী ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে দুই পক্ষকে শুনানির জন্য ডেকেছে নির্বাচন কমিশন (ECI)। ওই দিন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রতিনিধিদের কমিশনের সামনে হাজির হতে বলা হয়েছে। তার এক ঘণ্টা পর কালীঘাট-তৃণমূলের প্রতিনিধিদের শুনানি হবে। এ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন।
ফলে ১২ সেপ্টেম্বরের বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ওই দিনই কি জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে কমিশন? নাকি দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর সিদ্ধান্ত নিতে আরও সময় নেবে? এখনই তার উত্তর মিলছে না।
কালীঘাটের দাবি
কালীঘাট শিবিরের দাবি, উপনির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়ে গিয়েছে এবং আদর্শ আচরণবিধিও চালু হয়ে গেছে। তাই প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই কার্যকর থাকবে। তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, প্রার্থী ঘোষণা কিংবা প্রচার শুরু করতে তাঁদের কোনও বাধা নেই। তাঁর কথায়, “আদর্শ আচরণবিধি জারি হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচার শুরুতে বাধা নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই প্রতীক দেওয়ার অধিকার ছিল। কমিশন নতুন কোনও নির্দেশ দেয়নি। ফলে এখন আর নতুন করে তারা নির্দেশ দিতে পারবে না।”
কালীঘাট শিবিরের বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকা প্রতীক অনুমোদনের ক্ষমতা কমিশন এখনও বাতিল করেনি। ফলে উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থীদের জোড়াফুল প্রতীক দেওয়ার অধিকার এখনও তাঁর কাছেই রয়েছে বলে দাবি তাদের। তবে ১২ সেপ্টেম্বরের শুনানির পর কমিশন এই অবস্থান বদলাবে কি না, তা নিয়েই এখন জল্পনা চলছে।
ঋতব্রত শিবিরের দাবি
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও নিজেদের সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের আসল প্রতিনিধি বলে দাবি করছে। উপনির্বাচন যাতে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে হয়, সেই দাবি জানিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে দলীয় লেটারহেডে স্মারকলিপি দিয়েছে তারা।
তবে জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে তাঁদের নির্দিষ্ট দাবি বা আইনি অবস্থান এখনও প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। শিবিরের ঘনিষ্ঠ মহলের একাংশের দাবি, বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের মধ্যেই প্রতীক নিয়ে কমিশন কোনও অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত জানাতে পারে।
দুই পক্ষই নিজেদের মূল তৃণমূল বলে দাবি করায় কমিশনের সামনে বিষয়টি শুধু প্রতীক নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন কোন শিবিরের দিকে এবং দলীয় সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধ অধিকার কার—এসব বিষয়ও কমিশনের বিবেচনায় আসতে পারে।
জোড়াফুল কি ফ্রিজ হতে পারে?
সময়ের চাপের কথা মাথায় রেখে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, কমিশন আপাতত জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে মমতা ও ঋতব্রত—দুই গোষ্ঠীকেই আলাদা অস্থায়ী নাম ও প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে লড়তে হতে পারে। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের সময় নির্বাচন কমিশন এমন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মূল প্রতীক কোনও পক্ষকেই ব্যবহার করতে না দেওয়ার নজিরও রয়েছে।
তবে তৃণমূলের ক্ষেত্রে কমিশন শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নেবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কালীঘাট শিবিরের দাবি, ভোটের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার পর প্রতীক ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা উচিত নয়। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবির নিজেদের সাংগঠনিক ও পরিষদীয় শক্তির ভিত্তিতে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি জানাতে পারে।
১৬ সেপ্টেম্বর মনোনয়নের শেষ দিন
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৬ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বরের শুনানির পর প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য কমিশনের হাতে সময় থাকবে মাত্র কয়েক দিন। প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলীয় প্রতীক সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদনও জমা দিতে হয়। তাই জোড়াফুল কোন শিবির ব্যবহার করতে পারবে, নাকি কোনও পক্ষকেই আপাতত এই প্রতীক দেওয়া হবে না—তা দ্রুত পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, কমিশন যদি এই সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ঋতব্রতের বিরোধী দলনেতার পদও আদালতে
এর পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী দলনেতার পদ নিয়েও আইনি লড়াই চলছে। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আপাতত তাঁকে ‘প্রভিশনাল’ বা অস্থায়ী বিরোধী দলনেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। মামলাটি দ্রুত শেষ করার জন্য সিঙ্গল বেঞ্চকে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে শুনানি শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা, অন্যদিকে বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে আদালতের মামলা—দুই দিকেই ঋতব্রত শিবিরের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
এই মুহূর্তে অবশ্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উপনির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীক কে ব্যবহার করবে। মনোনয়নের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই গুরুত্ব বাড়ছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের। ১২ সেপ্টেম্বর কমিশন কোনও একটি শিবিরকে জোড়াফুল দেয়, প্রতীকটি ফ্রিজ করে, নাকি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে নেওয়ার কথা জানায়—তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে দুই তৃণমূল শিবিরের নির্বাচনী লড়াইয়ের পরবর্তী ছবি।


