দক্ষিণ ২৪ পরগণা: সৌন্দর্যায়নের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ, তারপর নদীতে তলিয়ে গেল ২৫০ মিটার বাঁধ! ডায়মন্ড হারবারে গঙ্গাপাড়ের সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প ঘিরে অভিষেকের (Abhishek Banerjee) বিরুদ্ধে এবার বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে আইনি পথে বিজেপি। বুধবার ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস ওরফে ববি (Abhijit Das Bobby)।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া ডায়মন্ড হারবারের গঙ্গাপাড়ের সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প। বিজেপি নেতার দাবি, তৎকালীন রাজ্য সরকারের পর্যটন দফতর এই প্রকল্পের জন্য পূর্তদফতরকে ৭ কোটি ১৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছিল।
কিন্তু প্রকল্প চলাকালীনই ঘটে বিপত্তি। অভিযোগ, ডায়মন্ড হারবার এসডিও গ্রাউন্ডের কাছে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে হুগলি নদীর প্রায় ২৫০ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে চলে যায়। বিজেপি নেতার দাবি, প্রকল্পের কাজ যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়াই হওয়ায় নদীবাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আর এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন! একটি সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে যদি নদীবাঁধই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই কাজের পরিকল্পনা ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল?ববির (Abhijit Das Bobby) অভিযোগ, পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের জন্য রাজ্য সরকারকে আরও ১৬ কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অর্থাৎ সৌন্দর্যায়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের পাশাপাশি বাঁধ মেরামতেও বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তাই নয়, প্রকল্পের কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার পাওনা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ। বিজেপি নেতার দাবি, ওই সংস্থার প্রায় আড়াই কোটি টাকা বকেয়া ছিল এবং তা নিয়ে হাই কোর্টে মামলাও হয়। পরে বকেয়ার অর্ধেকের মতো টাকা দেওয়া হলেও সম্পূর্ণ অর্থ মেটানো হয়নি বলে অভিযোগ। শেষপর্যন্ত ২০২৩ সালের মার্চে গোটা প্রকল্পই বাতিল হয়ে যায় বলে দাবি ববির।
এই ঘটনাগুলিকে সামনে রেখে বিজেপির অভিযোগ, যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা কার্যত ‘জলে’ চলে গিয়েছে। তবে এগুলি বিজেপি নেতার অভিযোগ, এর সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত।
এবার সরাসরি তদন্তের দাবি
CAG রিপোর্ট-সহ বিভিন্ন নথি পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে বুধবার ডায়মন্ড হারবার থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন অভিজিৎ দাস। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের কোনও অনিয়ম বা নয়ছয় হয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে।
অভিযোগে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সরকারি আধিকারিকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
বিজেপি নেতার আবেদন, অভিযোগের ভিত্তিতে FIR দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হোক এবং সরকারি অর্থের অপচয় বা অনিয়মের সঙ্গে কারা যুক্ত, তা চিহ্নিত করা হোক।
অন্যদিকে, এই অভিযোগের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমনটা এখনও বলা যায় না। পুলিশ বা প্রশাসনের তদন্তেই স্পষ্ট হবে প্রকল্পে সত্যিই কোনও আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল কি না, বাঁধ ক্ষতির সঙ্গে প্রকল্পের কাজের সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না এবং কারও ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক দায় রয়েছে কি না।
৭.১৭ কোটি থেকে ১৬ কোটি—প্রশ্নের মুখে পুরো প্রকল্প
একদিকে ৭.১৭ কোটি টাকার সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প, অন্যদিকে বাঁধ মেরামতে ১৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ, তার উপর বেসরকারি সংস্থার বকেয়া এবং শেষে প্রকল্প বাতিল! সব মিলিয়ে ডায়মন্ড হারবারের এই প্রকল্প ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এখন দেখার, পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া এই অভিযোগ কোন পথে এগোয় এবং তদন্তে সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে কী তথ্য সামনে আসে। সৌন্দর্যায়নের টাকা কি সত্যিই ‘জলে’ গিয়েছিল, নাকি পুরো ঘটনার পিছনে রয়েছে অন্য কোনও প্রশাসনিক বাস্তবতা? ডায়মন্ড হারবারে এখন সেই উত্তরই খুঁজছে রাজনীতি।


