স্নেহা পাল, কলকাতা: ১৮৬৬ সালের কথা। দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দির চত্বরে তখন শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের (Ramakrishna) সাধনার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় চলছে। সুফি সাধক গোবিন্দ রায়, যিনি ওয়াজেদ আলি খান নামেও পরিচিত, তাঁর কাছ থেকে ইসলামি সাধনার দীক্ষা নেওয়া শুরু করেন রামকৃষ্ণ (Ramakrishna)।
নিরাকার সাধনায় রামকৃষ্ণ
দীক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় তাঁর দৈনন্দিন জীবন। তিনি মুসলমানদের মতো পোশাক পরতে শুরু করেন। নিয়মিত নামাজ পড়তেন। ‘আল্লাহ’ নাম জপ করতেন এবং নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট রাখতেন। এই সময়ে তিনি হিন্দু দেবদেবীর কোনও চিন্তাই মনে আনতেন না। মন্দিরে যাওয়া কিংবা মূর্তিতে প্রণাম করা থেকেও তিনি বিরত থাকেন।
খাওয়া-পরা এবং থাকার ক্ষেত্রেও ছিল স্পষ্ট পরিবর্তন। পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা খাবার গ্রহণ করেন তিনি। মন্দির সীমানার বাইরে এসে বাস করতেন। আচরণে, অভ্যাসে এবং সাধনায় , সব দিক থেকেই নিজেকে একজন অ-হিন্দুর মতো করে গড়ে তোলেন তিনি।
স্বামী নির্বেদানন্দ তাঁর গ্রন্থ ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ও আধ্যাত্মিক নবজাগরণ’ এ উল্লেখ করেছেন, এই সময়ে রামকৃষ্ণের মনে হিন্দু দর্শন ও ভাবাবেগ সম্পূর্ণভাবে লুপ্ত হয়ে যায়। ইসলাম ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধির জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন।
ভিন্ন পথে একই উপলব্ধি
এই সাধনা চলে টানা তিন দিন। তারপর তিনি এক দিব্যজ্যোতির দর্শন লাভ করেন এবং এক গম্ভীর, দীর্ঘ দাড়িওয়ালা পুরুষের আবির্ভাব অনুভব করেন। ভক্তদের ধারণা, এই দর্শন ছিল হযরত মুহাম্মদের। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি নির্গুণ, নিরাকার ব্রহ্মের উপলব্ধিতে পৌঁছান।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে নতুন ছিল না। এর আগেও অদ্বৈত সাধনার পথে তিনি একই স্তরের উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন। এখানেই রামকৃষ্ণের বার্তা স্পষ্ট, পথ আলাদা হলেও গন্তব্যস্থল একই।
সীমানা ভেঙে সত্যের খোঁজ
ইসলাম সাধনার পর রামকৃষ্ণ (Ramakrishna) আবার হিন্দু ধর্মের সাধনায় ফিরে আসেন। তবে এই ফিরে আসা কোনও ধর্মের প্রত্যাখ্যান ছিল না। বরং তিনি বুঝেছিলেন, সত্য উপলব্ধির জন্য কোনও একটি ধর্মের সীমানায় নিজেকে বেঁধে রাখার প্রয়োজন নেই। তত্ত্ব আর আচরণের ফারাক থেকেই বিভাজনের জন্ম হয়, এই উপলব্ধি থেকেই তিনি শুধু ভাবনায় নয়, আচরণেও সেই সীমানা ভেঙে দেন।
এই কারণেই ইসলাম সাধনার পর তিনি খ্রিস্ট ধর্মের পথেও সাধনা করেন। তাঁর কাছে কোনও ধর্মই অপরের থেকে আলাদা বা বিরোধী ছিল না। বহুত্বের মধ্যেই তিনি একতার সত্য খুঁজে পেয়েছিলেন।
বেলুড় মঠে সহাবস্থানের চর্চা
এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন আজও দেখা যায় বেলুড় মঠে। সেখানে একটি মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়া হয়। সাথে বেলুড় মঠে বসবাস করেন একজন ৮৫ বছর বয়সী ইরানিয়ান মুসলিম সন্ন্যাসী। প্যারিসে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার পর তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। আজও তিনি নিয়মিত পাঁচবার নামাজ পড়েন এবং মঠের অসুস্থ সন্ন্যাসীদের চিকিৎসা করে থাকেন।
ধর্ম নিয়ে যখন চারদিকে বিভাজনের কথা শোনা যায়, তখন রামকৃষ্ণের এই জীবনকথা অন্য এক ছবি তুলে ধরে।


