Aaj India Desk, কলকাতা: কলকাতায় ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। শনিবার রবীন্দ্রসদনে (Rabindra Sadan) তাঁর ‘আত্মজীবনী সমগ্র’ বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দীর্ঘ ১৯ বছরের দূরত্ব, নির্বাসনের যন্ত্রণা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে কলকাতায় আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
বক্তৃতার শুরুতেই তসলিমা বলেন, কলকাতায় ফিরে এসেছেন—এই কথাটি বলতে তাঁর প্রায় দুই দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর কথায়, একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে ফিরতে পুলিশের নিরাপত্তার প্রয়োজন হওয়াই অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তিনি রাজ্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এরপর তিনি স্পষ্ট করেন, কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলতে তিনি আসেননি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বাকস্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানুষের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার। তসলিমার কথায়, ভয় বা নিষেধাজ্ঞা কোনওটাই চিরস্থায়ী নয়। একদিন না একদিন সব বন্ধ দরজাই খুলে যায়। তিনি আরও বলেন, অগস্ট তাঁর জন্মের মাস, নির্বাসনের মাস, আর এবার থেকে এই মাস তাঁর কাছে ফিরে আসারও মাস হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তসলিমা জানান, দেশ থেকে দূরে থাকতে হলেও বাংলাদেশ এখনও তাঁর মনের খুব কাছেই রয়েছে। রাষ্ট্র তাঁকে দেশছাড়া করতে পেরেছে, কিন্তু তাঁর ভেতর থেকে জন্মভূমিকে মুছে দিতে পারেনি। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার কোনও বিভাজন নেই। সীমান্তের কাঁটাতার জমিকে ভাগ করতে পারে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতিকে আলাদা করতে পারে না। নিজের নিষিদ্ধ হওয়া বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পরে আদালতের নির্দেশেই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশে নির্বাসিত হওয়ার প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন তসলিমা। তিনি বলেন, এমন কোনও অপরাধ তিনি করেননি, যার জন্য দেশছাড়া হতে হবে। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে, প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে রাষ্ট্রই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তাঁর মতে, এই নির্বাসন শুধু একজন ব্যক্তির নয়, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতারও পরাজয়।
ধর্ম ও সমাজ নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তসলিমা। তাঁর মতে, মানুষের মর্যাদা সব ধর্মের ঊর্ধ্বে। পাশাপাশি তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি থাকা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, বর্তমানে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
কলকাতায় ফিরে আসার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তসলিমা বলেন, একসময় তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, যদিও তিনি কোনও অপরাধ করেননি। সেই সিদ্ধান্তের কারণে জীবনের ১৯টি বছর হারাতে হয়েছে। তাই তাঁর কাছে এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, বরং দীর্ঘদিনের নির্বাসনের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী জয়।
বক্তব্যের শেষদিকে অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইতিহাস সবসময় মনে রাখে কারা মানুষের জন্য দরজা বন্ধ করেছিল এবং কারা সেই দরজা আবার খুলে দিয়েছিল। তাঁর মতে, অন্যায় অনেকদিন চলতে পারে, কিন্তু তা কখনও স্থায়ী হয় না।


