নয়াদিল্লি: এ যেন, দেশভাগের যন্ত্রণার পুনরাবৃত্তি। গোধূলি বেলার আলোয় দেখা, এক হাসি, ছোট্ট আলিঙ্গন—সবই এখন অব্যাহত স্মৃতি। কাছাকাছি থাকলেও হৃদয় দূরে, মেলামেশার স্বপ্ন সীমান্তের কাঁটাতারের পেছনে আটকে গেছে। সীমান্তের এপারে স্বামী সন্তান, ওপারে আটকে পড়েছেন স্ত্রী। গুজরাটের রাজকোটের এক মুসলিম পরিবারের এই যন্ত্রণার চিত্র সম্প্রতি সামনে উঠে এসেছে। স্বামী সন্তান ভারতে। আর কাঁটাতারের ওপারে করাচিতে, দেশে ফেরার আশায় বিগত তিন বছর ধরে দিন গুনছেন রিহানা (Rehana)।
২০১৫ সালে গুজরাটের রাজকোটের বাসিন্দা পারবেজ শেখ রিহানার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জানা গিয়েছে, রিহানা মূলত করাচিরই (Karachi) বাসিন্দা। পাকিস্তান থেকে রাজকোটে এসেই পারবেজ এবং রিহানার বিয়ে হয়। বিয়ের পর ভারত সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ভিসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বামীর সঙ্গে ভারতেই বসবাস শুরু করেন রিহানা।
প্রথম দিকের বছরগুলিতে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। রিহানার ভিসার মেয়াদও ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়েছিল। এই সময় দুটি সন্তান হয় রিহানা ও পারবেজের। রাজকোটে বেশ নিসচিন্তেই বসবাস করছিল মুসলিম পরিবারটি। কিন্তু ২০২২ সালে রিহানার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। সেই সময়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁকে পাকিস্তানে (Pakistan) গিয়ে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেয়। সেইমত, ২০২২-এর ডিসেম্বরে পরিবার নিয়েই পাকিস্তানের করাচি যান রিহানা।
পাকিস্তানে পৌঁছে ভিসা রিনিউয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। সেইসময় পারবেজও তাঁদের দুটি সন্তানকে নিয়ে প্রায় আড়াই মাস পাকিস্তানে থাকেন। তাঁরা ভেবেছিলেন কয়েকদিনের মধ্যেই ভিসা রিনিউয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভারতে ফিরে আসবেন। কিন্তু অদৃষ্টে যে লেখা ছিল চরম ভোগান্তি ও বিচ্ছেদ! রিহানার ভিসা রিনিউয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সময় বাড়তেই থাকে। পারবেন ও তাঁদের সন্তান্দের ভারতীয় হওয়ার কারণে দেশে ফিরে আসতে হয়। করাচিতেই থেকে যান রিহানা।
শুরু হয় অফিস-আধিকারিকদের পেছনে ছোটা
দেশে ফিরেই রিহানাকে ভারতে ফেরাতে রাজকোটের কালেক্টর কার্যালয়ে আবেদন করেন পারবেজ। তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, এই বিষয়ে তাঁরা কোনও সাহায্য করতে পারবেন না। পাকিস্তান দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয় পারবেজ শেখকে। এরপর দিল্লি-স্থিত পাকিস্তান দূতাবাসে যান পারবেজ। সমস্ত ঘটনা জানানোর পাশাপাশি স্ত্রীকে দেশে ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা করেন তিনি।
পহেলগাঁও ঘটনার পর ফেরা আরও মুশকিল হয়ে পড়ে
এসবের মধ্যে পহেলগাঁও ঘটনার জেরে ভারত-পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কের তিক্ততায় রিহানার দেশে ফেরার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ে। পারবেজ জানান, দিল্লি-স্থিত পাকিস্তান দূতাবাস থেকেও কোনও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। পাশাপাশি তিনি জানান, ইসলামাবাদের তরফে ভিসা দিতে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু রিহানাকে দেশে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারের অনুমতিও জরুরী। তাঁকে জানানো হয়েছিল, ভারত থেকে অনুমতি মিললেও রিহানাকে ভারতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
নরেন্দ্র মোদীর কাছে কাতর আর্জি রিহানার
গত তিন বছর ধরে পরিবারটির যোগাযোগের মাধ্যম কেবলমাত্র মোবাইল। তিন বছর ধরে তাঁদের দুটি সন্তান মাকে কেবলমাত্র ভিডিও কলে দেখতে পায়। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবার মোদী (Narendra Modi) সরকারের কাছে কাতর আর্জি জানিয়েছেন রিহানা। তিনি জানিয়েছেন, পাকিস্তানে থাকা কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। সেইকারনেই উনি ভারতে বিবাহ করেন। ভিডিও কলে কথাগুলি বলতে বলতে চোখের জল বাঁধ ভাঙে পাকিস্তানে আটকে পড়া এই মায়ের। বলেন, সন্তানদের ছাড়া তাঁর পক্ষে বাঁচা আর সম্ভব নয়।


