36 C
Kolkata
Thursday, April 2, 2026
spot_img

প্রতিশ্রুতি বহু, কাজ শূন্য! আরামবাগ-বোয়াইচণ্ডী রেল প্রকল্পে ‘জমিও নিজের, চাকরিও নিজের’ বিতর্ক

Aaj India Desk,সুরভী কুন্ডু: আরামবাগ-বোয়াইচণ্ডী রেল প্রকল্প একটা নাম, যা বছরের পর বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতির খাতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বাম (Communist Party of India)-এর আমলেই কার্যত এই প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছিল। ধাপে ধাপে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই চাকরির ব্যবস্থাও হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা এখন আরও তীব্র যে প্রকল্পের ভিত্তি এত আগে তৈরি, তার ‘সবুজ সংকেত’ আসতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন?এটা কি সরাসরি প্রশাসনিক অবহেলা?নাকি হিসাবের গরমিল?নাকি শুরু থেকেই পরিকল্পনার অভাব ছিল প্রকল্পের ভিতরে?

আরামবাগ – বোয়াইচণ্ডী প্রস্তাবিত রেলপথ ঘিরে আবারও উঠছে একাধিক প্রশ্ন। দুমাস আগে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) এই প্রকল্পের কাজ শুরু করার অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করলেও, বাস্তবে মাঠে কাজের অগ্রগতি এখনও কার্যত শূন্য।স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, বহু বছর আগে দামোদর নদের উপর রেল সেতুর পিলার নির্মাণ হয়েছিল, কিছু অংশে মাটির কাজও এগিয়েছিল। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকেই প্রকল্পটি কার্যত থমকে আছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ক্ষতিপূরণ ও চাকরি নিয়ে। অভিযোগ, প্রায় বছর দশেক আগে যেসব কৃষিজমি এই প্রকল্পের আওতায় পড়েছিল, সেই জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিবারের একজনকে রেলের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী অনেকেই চাকরি পেয়েছেনও। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। যেসব জমি প্রকল্পের জন্য অধিগৃহীত বলে দাবি করা হয়েছিল, সেই জমিতেই এখনও চাষাবাদ চলছে। অর্থাৎ জমির মালিকরা একদিকে জমি হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকারি চাকরি পেলেন, অন্যদিকে জমিও রয়ে গেল ব্যবহারযোগ্য অবস্থায়।এতে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বহু শিক্ষিত যুবক-যুবতী বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও যেখানে একটি সরকারি চাকরির জন্য সংগ্রাম করছেন, সেখানে শুধুমাত্র জমির ক্ষতিপূরণের ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উঠছে নৈতিকতার প্রশ্ন।

রেলওয়ে গ্রুপ-ডি (Level-1) পরীক্ষা যেখানে প্রতি বছর হয় না, ২-৩ বছর অন্তর আয়োজন করা হয়, আর সেখানে আবেদন পড়ে ১ কোটিরও বেশি। ২০২৪ সালের চিত্রই বলছে, একটি পদের জন্য লড়াই হাজার হাজার প্রার্থীর মধ্যে। ২০২৬ সালে প্রায় ২২,০০০+ শূন্যপদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও প্রতিযোগিতার মাত্রা যে কতটা তীব্র, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।এই বাস্তবতার মধ্যেই উঠে আসছে এক বিতর্কিত প্রশ্ন যেখানে একজন সাধারণ ছাত্র বা ছাত্রী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েও নিশ্চিত হতে পারে না নিজের ভবিষ্যৎ, সেখানে অন্যদিকে শুধুমাত্র জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ কেউ সরাসরি চাকরির আসন পেয়ে যাচ্ছে!এটা কি তাহলে দুই ধরনের নিয়োগব্যবস্থা ?একদিকে কঠোর প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে “ক্ষতিপূরণের শর্টকাট” ?

সমালোচকদের মতে, এই ধরণের প্রক্রিয়া শিক্ষিত সমাজের প্রতি একপ্রকার অবিচার। কারণ, যারা মেধা, পরিশ্রম আর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগোতে চায়, তাদের সামনে যখন এমন উদাহরণ আসে, তখন পুরো ব্যবস্থার উপরই আস্থা নড়ে যায়। আরও বড় প্রশ্ন এই দায় কার?প্রশাসনের, যারা এই নীতিকে অনুমোদন দিয়েছে? নাকি সেই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার, যেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে?অবশ্যই জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরি এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ক্ষতিপূরণ যদি সরাসরি চাকরির মাধ্যমে দেওয়া হয়, এবং একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজও বাস্তবে এগোয় না, তাহলে তা আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দেয়।এই পরিস্থিতিতে শিক্ষিত যুব সমাজের একাংশের বক্তব্য, “আমরা কি ভুল পথে হাঁটছি? পড়াশোনা, পরীক্ষা, মেধা সবকিছু পেরিয়েও যদি সুযোগ অনিশ্চিত হয়, আর অন্যদিকে প্রতিযোগিতা ছাড়াই চাকরি মেলে, তাহলে এই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা থাকবে কীভাবে?” উন্নয়নের নামে যদি এই ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় এটা সামাজিক ভারসাম্যকেও নষ্ট করতে পারে। শেষমেশ প্রশ্নটা থেকেই যায় চাকরি কি আজ সত্যিই মেধার মূল্যায়ন, নাকি পরিস্থিতিভেদে ‘সহজলভ্য ‘ সুযোগ? স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, “প্রকল্পের কাজ যদি বাস্তবে শুরুই না হয়, তাহলে এই নিয়োগের ভিত্তি কী? আর জমি যদি এখনও চাষযোগ্য থাকে, তাহলে অধিগ্রহণের প্রকৃত অবস্থান কোথায়?” অন্যদিকে, প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে স্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। ফলে পুরো বিষয়টি ঘিরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা এবং বিতর্ক।

এখন দেখার বিষয়, বহু প্রতীক্ষিত আরামবাগ -বোয়াইচণ্ডী রেল প্রকল্প আদৌ গতি পায় কি না, নাকি এই প্রকল্পও থেকে যাবে কাগজে-কলমেই আর বাস্তবে চলবে “জমিও নিজের, চাকরিও নিজের”এই বিতর্কিত সমীকরণ।

 

 

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন