29 C
Kolkata
Thursday, April 2, 2026
spot_img

পুরশুড়ায় মাঠেই খড়চাপা আলু, হিমঘর নয় অপেক্ষাতেই ভরসা চাষিদের

Aaj India Desk,হুগলি : মাঠজুড়ে যেন সোনার ফসল, অথচ বাজারে তার এখনও ঠিক দাম ওঠেনি। তাই তাড়াহুড়ো নেই পুরশুড়ার আলুচাষিদের। তোকিপুর থেকে কেশবপুর, জঙ্গলপাড়া থেকে তালপুর খড়ের নরম আস্তরণের নিচে সারি সারি আলু যেন সময়ের অপেক্ষায় শুয়ে আছে।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে হিমঘরে জায়গা হয়নি, তাই কি এই অবস্থা? কিন্তু ছবির ভিতরে লুকিয়ে আছে এক অন্য গল্প। এটা অভাবের নয়, বরং অভিজ্ঞতার কৌশল।পুরশুড়ার বালিমাটিতে ফলানো আলুর গুণমান নিয়েই গর্ব চাষিদের। বছরের পর বছর তাঁরা শিখেছেন এই মাটির আলু সহজে নষ্ট হয় না, বরং সময় পেলে দাম বাড়ায়। তাই হিমঘরের অতিরিক্ত খরচ না করে, খড় চাপা দিয়েই মাঠে রেখে দেন ফসল।

এখন বাজারে জ্যোতি ২০০ টাকা বস্তা, চন্দ্রমুখী ৩০০ সংখ্যাটা আশাব্যঞ্জক নয় ঠিকই। কিন্তু চাষিরা জানেন, এই অপেক্ষাই একদিন লাভ এনে দেয়। বৈশাখের শুরুতেই সেই একই আলু ৫০০ ছুঁতে পারে, কখনও তারও বেশি।এই “অপেক্ষার চাষ” আসলে পুরশুড়ার এক পুরনো ট্র্যাডিশন যেখানে সময়ই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।এর মাঝেই রাজ্যজুড়ে আলু বাইরে পাঠানোর খবর, সরকারের আশ্বাস সব মিলিয়ে চাষিদের মুখে এখন হালকা হাসি। কারণ, তারা জানে মাঠে পড়ে থাকা এই আলুগুলো আসলে পড়ে নেই, বরং ধীরে ধীরে পেকে উঠছে লাভের সম্ভাবনা।

পুরশুড়ার এই গ্রামগুলো যেন আলুচাষের এক আলাদা দর্শন মেনে চলে এখানে ফসল মানেই তাড়াহুড়ো করে বিক্রি নয়, বরং সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া। তাই তোকিপুর, কেশবপুর বা তালপুরে মাঠে পড়ে থাকা আলু কোনও অব্যবস্থার ছবি নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের।তোকিপুরের কৃষ্ণ সামন্ত (Krishna Samanta) এক বিঘা জমিতে আলু করেছেন, কেশবপুরের তাপস সামন্ত (Tapash Samanta) ছয় বিঘা জুড়ে চন্দ্রমুখী। কিন্তু দুজনের কথাতেই এক সুর “অপেক্ষা করলেই লাভ।” খড়ের আড়ালে শুয়ে থাকা আলু যেন তাদের কাছে জমিয়ে রাখা সঞ্চয়। এখন বাজারদর কম, হিমঘরের খরচ বেশি তাই তাড়াহুড়ো নেই। বরং সময়ই তাদের ভরসা।এই মাটির ওপর তাদের অদ্ভুত আস্থা। বেলে মাটি, খড়ের ঢাকনা এই যুগলবন্দিতেই আলু নষ্ট হয় না, বরং ভালো দামের অপেক্ষায় থাকে।

স্থানীয় চাষি তথা তৃণমূল নেতা গোপাল রায়ের কথায়, “এটাই পুরশুড়ার চরিত্র।”বছরের অভিজ্ঞতা বলছে চৈত্রের শেষে বা বৈশাখের শুরুতেই বাজার বদলায়, আর সেই বদলের সঙ্গেই চাষিদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি।

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন আশ্বাস ভিন রাজ্যে আলু পাঠানো শুরু হয়েছে, বাজারের চাকা ঘুরছে।সাথে রাজনৈতিক ভরসাও আছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-র উপর আস্থা রেখে চাষিরা মনে করছেন, আগেও যেমন পাশে দাঁড়িয়েছেন, এবারও কোনও না কোনও পথ বেরোবে।তাই মাঠে পড়ে থাকা আলু এখানে দুশ্চিন্তার ছবি নয়এ যেন ধৈর্যের পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষার ফল মেলে ঠিক সময়েই।

হিমঘরের দরজা প্রায় বন্ধ ভিতরে যতটা জায়গা ছিল, ততটাই ভরে গিয়েছে। তার বাইরে আর জায়গা নেই বললেই চলে। কিন্তু তাতেই যেন খুব একটা অস্থিরতা নেই পুরশুড়ার চাষিদের মধ্যে। কারণ, তারা জানে তাদের পথটা একটু আলাদা।রাজ্য প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, হিমঘরে যা ঢোকার, তা ঢুকে গিয়েছে অনেক আগেই। আর হিমঘর খোলার সময়েই সাধারণত বাজারদর একটু চাঙ্গা হয়।কিন্তু পুরশুড়ার গল্পটা অন্য।এখানে সব আলু হিমঘরের ওপর নির্ভর করে না। বরং মাঠই হয়ে ওঠে অস্থায়ী গুদাম। খোলা আকাশের নিচে, খড়ের আস্তরণে ঢাকা আলু সেখান থেকেই ধীরে ধীরে মহাজনদের হাতে বিক্রি হয়ে যায় ফসল।এই পদ্ধতি খুব একটা সর্বত্র দেখা যায় না। লালু মুখোপাধ্যায়ও এও বলেন “এটা মূলত ওই এলাকারই বিশেষ ধরণ।”অর্থাৎ, যেখানে অন্য জায়গায় হিমঘরই শেষ ভরসা, সেখানে পুরশুড়ার চাষিরা ভরসা রাখেন অভিজ্ঞতা আর সময়ের ওপর। আর সেই ভরসাই প্রতি বছর তাদের আলাদা করে চেনায়।

 

 

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন