Aaj India, পূরবী প্রামানিক: বাণিজ্যিক ছবির দুনিয়ায় সিক্যুয়েল মানেই বাড়তি প্রত্যাশা। প্রথম পর্বের সাফল্যের পর দ্বিতীয় পর্ব সেই জায়গা ধরে রাখতে পারবে তো? সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়! আর এবার সেই প্রত্যাশা নিয়েই পর্দায় ফিরেছে ধুরন্ধর 2। বক্স অফিসে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে আদিত্য ধরের এই নতুন ছবি ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’। রণবীরের ‘হামজা আলি মাজারি’ অবতার দেখতে প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন জমজমাট। প্রথম ধুরন্ধর-এর গল্প যেখানে থেমেছিল, সেখান থেকেই যেন নতুন মোড় নিয়ে শুরু এই পর্ব। আর শুরু থেকেই স্পষ্ট আগের ছাপ বজায় রেখেই আরও জটিল, আরও গাঢ় এক দুনিয়া তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
গল্পটা শুরু হয় এক সাধারণ দর্শকের অভিজ্ঞতা দিয়ে। সে হলে ঢোকার সময় হয়তো শুধু একটা অ্যাকশন সিনেমা দেখার আশা নিয়েই গিয়েছিল। অন্ধকার থেকে যখন ছবির পর্দা ধীরে ধীরে আলোয় ভরে ওঠে, তখন মনে হয় – এই গল্পটা কোথাও যেন চেনা। কিন্তু একটু এগোতেই বোঝা যায়, তার সেই চেনা পথেই অচেনা মোড় অপেক্ষা করছে। ছবি যত এগোয়, ততই সে বুঝতে পারে – এটা শুধু লড়াই বা প্রতিশোধের গল্প নয়, বরং আরও বড় কিছু রয়েছে এখানে। অ্যাকশনের দৃশ্যগুলো চোখে লাগে, গল্প বলার ধরণ টানটান করে রাখে, আর তার মাঝেই Ranveer Singh–এর অভিনয় যেন আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়। হলের অন্ধকারে বসে দর্শক অনুভব করে, একটা চরিত্র কীভাবে ধীরে ধীরে তার ওপর প্রভাব ফেলছে।
গল্পের কেন্দ্রে যে চরিত্রটি বারবার ফিরে আসে, সে হল “হামজা”। তাকে এককথায় নায়ক বা খলনায়ক – কিছুই বলা যায় না। বরং সে এমন একজন, যে পরিস্থিতির সঙ্গে লড়তে লড়তে নিজেই এক জটিল চরিত্রে পরিণত হয়েছে। প্রথম ধুরন্ধর যখন মুক্তি পেয়েছিল, তখন অনেকেই বলেছিলেন – এটা শুধু একটা থ্রিলার নয়, বরং এক অন্যরকম মানসিক খেলার গল্প। সেই জায়গা থেকেই শুরু ধুরন্ধর 2-এর যাত্রা। আগের ছবির অসমাপ্ত টান, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন আর চরিত্রদের ভিতরের দ্বন্দ্ব – সব মিলিয়ে এই পর্ব যেন আরও গভীরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেছে।
‘হামজার’ সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে দর্শকের মনে। তার আত্মবিশ্বাস, পরিস্থিতিকে নিজের পক্ষে আনার ক্ষমতা অনেককে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তার এই দিকগুলো থেকে অনুপ্রেরণা পায়। হামজা আগে ভাবে, তারপর কাজ করে। কিন্তু সেই ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে দ্বিধা, রাগ, প্রতিশোধ আর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে। কখনও মনে হয়, সে ঠিক পথেই হাঁটছে – নিজেকে বাঁচানোর লড়াইয়ে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আবার কিছু মুহূর্তে তার সিদ্ধান্তই দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এই অস্বস্তিই আসলে ছবির আসল সাফল্য, কারণ তা আমাদের নিজের ভেতরটাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কিন্তু এখানে আবার একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে। হামজার কিছু সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয়, সাফল্যের পথে সবসময় শর্টকাট নেওয়া ঠিক নয়। এই দ্বৈত প্রভাবই চরিত্রটিকে আরও বাস্তব করে তোলে।
এই ছবির ভিত আরও মজবুত করেছে পার্শ্ব চরিত্রগুলি। ছবিতে ‘হামজার’ চারপাশে যে মানুষগুলো রয়েছে, তারা কেউই শুধুই সহায়ক চরিত্র নয়, বরং প্রত্যেকেই গল্পের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাদের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত মিলিয়েই তৈরি হয় এক জটিল সম্পর্কের জাল, যা গল্পকে আরও বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। কেউ তার পাশে দাঁড়ায়, কেউ তার বিরুদ্ধে যায়, আবার কেউ নিজের স্বার্থে পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে। এই সম্পর্কগুলোর টানাপোড়েনই গল্পটিকে আরও সত্যি করে তোলে। মনে হয়, এরা সবাই যেন আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি – যেখানে বিশ্বাস যেমন সহজে তৈরি হয় না, তেমনই সহজে ভেঙেও যায়। ফলে ছবিটি শুধুমাত্র একজনের লড়াই নয়, বরং এক জটিল সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
ধুরন্ধর 2-এর গল্প শুধু উত্তেজনা বা টুইস্টের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। সমাজের প্রেক্ষাপটে ধুরন্ধর 2 এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সমাজের এক স্পষ্ট ছবি। ক্ষমতার লড়াই, প্রতিশোধ আর বিশ্বাসঘাতকতা – এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ছবিটি দেখায় – মানুষ পরিস্থিতির চাপে কতটা বদলে যেতে পারে। এই দিকটি দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে – নৈতিকতা কি সবসময় একই থাকে, নাকি সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বদলে যায়?
দর্শকদের প্রতিক্রিয়া
এদিকে দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও একরকম নয়, বরং নানা রঙে ভরা। কেউ এর গতি, স্কেল ও অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন, কেউ আবার গল্পের কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ ছবিটিকে ‘মাস্ট-ওয়াচ’ বলে দিচ্ছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি প্রথম পর্বের থেকেও বড় এবং আরও পরিণত। প্রত্যেকেই যেন নিজের মতো করে ছবিটিকে ব্যাখ্যা করতে চাইছে। এই ভিন্ন ভিন্ন মতামতই ছবিটিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তবে এখান থেকে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার – এই ছবি দর্শকদের মনে বেশ ভালই প্রভাব ফেলেছে। আর এই ছবির সাফল্য শুধু সাধারণ দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইন্ডাস্ট্রির ভেতর থেকেও এসেছে প্রশংসা। দক্ষিণের জনপ্রিয় তারকারা, যেমন- Allu Arjun, Mahesh Babu, Jr NTR – খোলাখুলিভাবে ছবিটির প্রশংসা করেছেন। তাঁদের এই প্রতিক্রিয়া যেন ছবির সাফল্যকে আরও বড় করে তুলেছে। এক ধরনের সম্মানও যেন জুড়ে দিয়েছে এই সাফল্যের সঙ্গে।
সব মিলিয়ে, ধুরন্ধর 2 এমন এক ছবি, যা শুধু আমাদের বিনোদনই দেয়নি, বরং ধীরে ধীরে দর্শকের মনেও ঢুকে পড়েছে। এটি এমন এক গল্প, যা আমাদের নিজেদের ভেতরের ধূসর জায়গাগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আর হয়তো সেই কারণেই, ছবিটি শেষ হওয়ার পরও গল্পটা কোথাও যেন চলতেই থাকে – আমাদের ভাবনার মধ্যে, আমাদের প্রশ্নের মধ্যে।।


